থানার ছবিও কখনো বদলায়

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ০৭:৩৩ এএম

গত কোরবানির ঈদে পল্লবী থানায় ঢুকলাম তৃতীয়বারের মতো। ব্যক্তিগত কাজে এসেছি এখানে। আগের সেই পল্লবী থানা আর নেই। নতুন ভবন, নতুন পরিবেশ। আধুনিক সাজসজ্জা, আলো ঝলমলে থানার অভ্যন্তর ঝকঝকে। বাইরের আলো-বাতাস যেন থানায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ঢুকতে পারে, এমনভাবে ভবনের নকশা করা। নিচে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা, রিসেপশন এবং নাগরিক বিভিন্ন সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে।

চওড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই একজন নারী ডিউটি অফিসারের দেখা মিলল। তিনি বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে যারা আগে এসেছে তাদের আগে সেবা দিচ্ছেন। আগে ভদ্রলোক গোছের বা একটু অবস্থাপন্নদের আগে সুযোগ দেওয়া হতো, সেই সংস্কৃতি এখন আর নেই। ক্ষমতাধর কেউ এলে কী হতো তা অবশ্য দেখার সুযোগ পাইনি।

আমার আসার কারণ ব্যাখ্যার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। এর মধ্যে একজনকে ধরে নিয়ে এলেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। সেই ব্যক্তি হাউমাউ করে কাঁদছেন। তাকে ছেড়ে দিতে বলছেন। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা রাজি নন। এর আগে তাকে সুযোগ দেওয়া হলেও তার সংশোধন ঘটেনি। এবার তাই ছাড় নয়।

সিরিয়ালে আমার ডাক পড়লে ডিউটি অফিসারকে জানালাম সমস্যাটা। তিনি সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার জন্য অপেক্ষা করতে বললেন। আমি বের হয়ে এলাম ওই কক্ষ থেকে। দোতলায় দুটি অংশ। বাম দিকের একটি বড় ঘরে যার যার টেবিল সামনে রেখে কাজে ব্যস্ত অনেকে। ডান দিকে লম্বা করিডর ধরে কর্মকর্তাদের কক্ষ। তারা সবাই কাজের প্রয়োজনে বাইরে ছিলেন। মোবাইল ফোনে একজনকে বলতে শুনলাম, ডিসি সাহেব আসছেন এদিকে। তার প্রটোকলের ব্যবস্থা করতে হবে।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতেই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) লেখার ডেস্ক। একজন পুরুষ সদস্য মনোযোগ দিয়ে লিখে দিচ্ছেন জিডি। 

এসব দেখতে দেখতে আমার কাক্সিক্ষত কর্মকর্তা চলে এলেন। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তিনি সমস্যার কথা আগেই জানতেন। ফলে বিস্তারিত বলতে হলো না। তিনি আমাকে জিডির ডেস্কে নিয়ে গেলেন। এক তরুণ নির্দিষ্ট প্যাডে জিডির কপি লিখছেন। তার হাতের লেখা বেশ সুন্দর। দ্রুত লিখতে পারেন। জিডিতে প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বাড়তি কিছু লিখতে তিনি নারাজ। জিডিতে অভিযোগকারীর পক্ষের নামে যা খুশি তাই তিনি কিছুতেই লিখবেন না।

কিছুক্ষণ পর মাথায় কাটা দাগ নিয়ে এলেন এক নারী। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল। ডেস্কে এসেই তিনি বলতে শুরু করলেন, আমারে আবার মারছে, আজ দুপুরে ভাতের কথা বইলা আবার মারছে। বুঝলাম, তার স্বামী তাকে পিটিয়েছেন আবার। তাকে আরেকজন ধরে ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে আগে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তারপর জিডি করতে বললেন। 

আমার কাজও ততক্ষণে শেষ হয়ে এসেছে। ডেস্কের সামনে কিছু বসার চেয়ার। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ বসে আছেন। সবার বামে বসা এক নারী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তার কান্না আটকে রাখা যাচ্ছে না। স্বজন হারানোর বেদনা মাঝে মাঝে জানান দিচ্ছে আশপাশ। শোক তাকে চেয়ারেও বসতে দিচ্ছে না। ধরে রাখতে হচ্ছে। কেউ একজন মারা গেছেন তার। মামলা করতে থানায় এসেছেন। স্বাভাবিক কর্মপরিবেশেও তার শোক সঞ্চারিত হচ্ছে অন্যদের মধ্যে। তবে শোক থিতু হওয়ার অবকাশ নেই। যারা আসছেন তাদের সবাইকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। 

আমার মনে হলো, প্রতিনিয়ত শোক, অপরাধের ঘটনা, সামাজিক নির্যাতনের ঘটনা সব দেখতে-শুনতে হয় পুলিশ সদস্যদের। সামাল দিতে হয়। তাদের কাজ আসলেই অনেক জটিল ও কঠিন।

অথচ পল্লবী থানার পরিবেশ এমন ছিল না। ২০১১-১২ সালের ঘটনা। আমার প্রথম ফোন চুরি হয় ওই সময়ে। খোলা জানালা দিয়ে লম্বা বাঁশের আগায় লোহার সঙ্গে চুম্বক জুড়ে আমার চার্জে রাখা ফোনটা নিয়ে যায় চোর। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সকালে উঠে অনেক খুঁজেও যখন পেলাম না, বুঝলাম চুরি হয়েছে। চুরির এ পদ্ধতির কথা আগেই শুনেছিলাম। আমাদের ওপর তলার একজনের মোবাইল ফোনও এ পদ্ধতিতে চুরি হয়।

জীবনে প্রথম জিডি করার জন্য থানায় গেলাম। ‘ভদ্রলোকরা থানায় যান না’ এ রকম একটা কথা আমাদের সমাজে একসময় চালু ছিল। থানায় গেলেই ‘কলঙ্কের দাগ’ লেগে যাবে। তাই চুপি চুপি, পরিচিত কেউ যেন না দেখে এমন ভঙ্গিতে ঢুুকলাম পল্লবী থানায়।

পল্লবী থানা তখন ছিল ভাড়া বাড়িতে। পলেস্তারা ছিল না ওই ভবনের। ভবনটাও ছিল অনুজ্জ্বল, অনাধুনিক। সংকীর্ণ ঢোকার পথ, ছোট ছোট রুম। মরচে ধরা কলাপসিবল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম। ঢুকতেই বাম দিকে দেখলাম, সিমেন্টের বস্তা দিয়ে অনেকটা বাঙ্কারের মতো একটা জায়গা। সেখানে একজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে। বুঝলাম, এটা নিরাপত্তার প্রয়োজনে করা।

নিচতলায় আর কী আছে বুঝতে পারলাম না। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে এসেছি জানালে একজন পুলিশ দোতলায় যেতে বলেন। আবছা আলোয় সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। সেখানে অপেক্ষাকৃত একটা বড় ঘর। তবে তাতে অপ্রতুল আলো। কাঠের চেয়ার-টেবিলে বসে আছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তাদের কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা জানালাম। তারা কক্ষের বাইরে একটা কাউন্টার দেখিয়ে দিলেন। কাউন্টারে বসা পুলিশ সদস্য জিডির কারণ জানতে চাইলেন। তিনি কেমন যেন গড়িমসি করছিলেন। তাকে বোঝাতে বোঝাতে হতাশ হয়ে যাব এমন সময় পরিচিত বড় ভাইকে পেলাম। আমার ইউনিভার্সিটির বড় ভাই। এ থানায় ইন্সúেক্টর (তদন্ত) হিসেবে যোগ দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পরে দেখা। এ থানায় কবে এসেছেন জানতাম না। আমাকে দেখে তিনি নিয়ে গেলেন আরেক তলা ওপরে। প্রায়ন্ধকার ঘরে দেখলাম, বসার টেবিলের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থাও আছে। লুঙ্গি-গামছা ঝুলছে। ভাই আমাকে চা পানের সুযোগ দিলেন। তারপর নিচে থাকা সেই পুলিশ সদস্যকে ডেকে এনে আমার জিডি নিতে বললেন। ওনার সঙ্গে আবার দোতলায় এলাম। একটা নিউজপ্রিন্টের প্যাডের নিচে কার্বন পেপার রাখলেন। তারপর একপাশ খালি রেখে আমার অভিযোগ লিখলেন। তার মুখ কিঞ্চিৎ ভারী।

একবার যাওয়ার পর থানা নিয়ে আমার অস্বস্তি বা ভয় অনেকটা কেটে গেল। আমার মনে হলো, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা বা বিচার পাওয়ার শুরু হয় থানা থেকেই। সেখানে যেতে কারও মনে দ্ব্যর্থতা থাকা ঠিক নয়।

পল্লবী থানা আমার বাসার উল্টো পাশে। প্রতিদিন রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে দেখতাম মানুষের জটলা। বুঝতাম কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার আত্মীয়-স্বজন থানার বাইরে জটলা করছে। আহাজারি করছে।

পল্লবী থানার এই দুই পরিস্থিতির মধ্যবর্তী আরেকটি পরিবর্তনেরও আমি সাক্ষী। সেটা মোবাইল ফোন চুরির বেশ কয়েক বছর পরের কথা। আরেকটা জিডি করার প্রয়োজন হলো আমার। তবে সেবার জিডি লেখাতে হলো বাইরে থেকে। থানার বাইরেই কিছু লোক থাকেন। তারা নির্দিষ্ট ফরম্যাটে জিডি লিখে দেন। এর জন্য তারা কিছু ‘পারিশ্রমিক’ নেন।

আমার দ্বিতীয় জিডিটিও ছিল মোবাইল ফোন সংশ্লিষ্ট। প্রথমবারের মোবাইল ফোনের খোঁজ পাইনি। পরেরবার বেশ দ্রুতই মোবাইল ফোনের সন্ধান মিলল। পুলিশ এখন অনেক আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। নাগরিকদের সুবিধা দেওয়ার পরিসরও বেড়েছে। অনলাইনেও এখন জিডি করা যায়।

পুলিশ নিয়ে অনেক আপত্তি-অভিযোগ আছে এ কথা সত্য। তবে আমার এ লেখা তা নিয়ে নয়। আমি শুধু থানার সঙ্গে আমার যোগাযোগের স্মৃতি উল্লেখ করলাম। থানায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে একথা বলতেই হবে।

আমার পরিচিত সেই বড় ভাই এখন সিটিটিসিতে (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) ইউনিটে আছেন। তিনিও স্বীকার করলেন পল্লবী থানা বদলে গেছে অনেক। পুলিশ এবং নাগরিক সবার সুবিধা বেড়েছে। মনে মনে বললাম, নাগরিক সুবিধার অবারিত স্থান হয়ে থাক পুলিশ স্টেশন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত