বিদেশি মুদ্রার সংকটে অনেক ক্ষেত্রেই কৃচ্ছসাধন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। উন্নয়ন কর্মকান্ড কমিয়ে আনার পাশাপাশি আমদানিও সীমিত করা হয়েছে। তারপরও জরুরি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে উন্নয়ন সহযোগীসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে যখন বিদেশি ঋণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি তখন উল্টো চিত্র দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমে গেছে। এমনকি ঋণের প্রতিশ্রুতি আরও বেশি কমেছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৩৭৮ কোটি ডলার। অথচ ২০২১-২২ অর্থ বছরের একই সময়ে অর্থছাড় হয়েছিল ৪১৭ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমেছে ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। প্রায় ৩৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলার অর্থছাড় কমেছে।
অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় অবমূল্যায়নের কারণে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও চাপে পড়েছে সরকার। আগের চেয়ে বেশি বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১০৫ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের সমপরিমাণ ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১০৪ কোটি ৩ লাখ ডলার। ডলারে পরিশোধের পরিমাণ মাত্র ১ কোটির একটু বেশি হলেও টাকার হিসেবে পরিমাণটি তুলনামূলক বেশি। ডলারের দাম বাড়ায় ১ হাজার ২৬১ কোটির বেশি টাকা খরচ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এ খাতে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ১৪০ কোটি টাকা টাকার বেশি। গত বছর একই সময়ে যা ছিল ৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকার বেশি। উল্লেখ্য বর্তমানে প্রতি ডলার ১০৭ টাকা এবং গত বছর একই সময় ৮৬ টাকার কাছাকাছি ছিল।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে উন্নয়ন সহযোগী দেশ জাপান। দেশটি ৯২ কোটি ১৬ লাখ ডলার অর্থছাড় করেছে। এরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থছাড় করেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), ৫৬ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। বিশ^ব্যাংকের আইডিএ প্রোগ্রামের আওতায় অর্থছাড় হয়েছে ৫৪ কোটি ডলারের বেশি। চীন থেকে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার, রাশিয়া থেকে ৪৩ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, ভারত থেকে ১৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার ও অন্য সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড় হয়েছে ৩৬ কোটি ২৮ লাখ ডলার।
এ ছয় মাসে ঋণচুক্তির পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ১৭৬ কোটি ২২ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে ঋণচুক্তি হয়েছিল প্রায় ৪৪০ কোটি ডলারের। এক বছরের ব্যবধানে ঋণচুক্তির হার কমেছে অর্থাৎ ৫৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ৩৮ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করলেও এবার করেছে মাত্র ৩৪ লাখ ডলারের। বিশ^ব্যাংক গত বছর ছয় মাসে ৫০ কোটির চুক্তি করলেও এবার করেছে মাত্র ৩০ কোটি ডলারের। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এখনো ঋণচুক্তিতে এগিয়ে আসেনি। তবে যথারীতি এডিবি ঋণচুক্তি করে যাচ্ছে। এ বছর সংস্থাটি ঋণচুক্তি করেছে ৮৩ কোটি ৮২ লাখ ডলারের, এর আগের বছর একই সময়ে তা ছিল ৮১ কোটি ৯২ লাখ ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নয়ন সহযোগীরাও এবার ঋণচুক্তি কম করেছে। এ সময় ইইউ থেকে চুক্তি হয়েছে ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের, আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৯১ কোটি ৪১ লাখ ডলার। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়েছে ২৫ কোটি ডলারের, আগের বছর তা ছিল ১৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
ঋণ চুক্তির পরিমাণ কমলেও এ সময়ে ঋণচুক্তির অপেক্ষায় আলোচনায় বা পাইপলাইনে রয়েছে ৯৭২ কোটি ডলার। সবচেয়ে বেশি আসবে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান থেকে ২৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার, বিশ^ব্যাংক থেকে ২৩৫ কোটি ২০ লাখ ডলার, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসবে ১৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ পেয়েছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। আড়াই বছরের করোনা মহামারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় চাপে পড়া অর্থনীতিকে সামাল দিতে কম সুদের বিশাল অঙ্কের এই ঋণ বেশ অবদান রেখেছিল।
কিন্তু সেই জোয়ার আর নেই। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের অন্যতম উৎস বিদেশি ঋণপ্রবাহে ভাটা পড়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ঋণ-সহায়তা ধীরে ধীরে কমছে।
