মুফতি হিফজুর রহমান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত। লেখালেখির অভ্যাস সেই ছাত্রজীবন থেকে। গবেষণা তার নেশা। বাংলা ও আরবি দুই ভাষাতেই রয়েছে তার লেখনী। তবে আরবি ভাষায় কয়েকটি সিরিজ গ্রন্থ রচনা করে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। লিখেছেন জহির উদ্দিন বাবর
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই আরবি ভাষার চর্চা হয়ে থাকে। কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আরবি পড়ানো হয়। আলিয়া মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়েও আরবির চর্চা হয়। তবে বাংলাদেশিদের মধ্যে আরবি ভাষায় লেখালেখির চর্চা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। টুকটাক লেখালেখি ও গবেষণামূলক কাজ হলেও সেটা আরবিভাষী লোকদের কাছে খুব একটা পৌঁছেনি। সম্ভবত বাংলাদেশি আলেমদের মধ্যে আরবি ভাষায় বড় ধরনের গবেষণামূলক কাজের জন্য সর্বপ্রথম পরিচিতি লাভ করেন মুফতি হিফজুর রহমান। বিশেষ করে তার লিখিত তেইশ খণ্ড ও আট খণ্ডের দুটি সিরিজ মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। যে কারণে কোটি কোটি আরবিভাষীর কাছে বাংলাদেশ পরিচিত হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তিনি মোট ১৯টি গ্রন্থ আরবিতে রচনা করেছেন। আরও বেশ কিছু আরবি গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পথে।
মুফতি হিফজুর রহমান পুরোদস্তুর একজন শিক্ষক। লেখালেখি তার পেশা ও নেশা। পড়া, পড়ানো এবং লেখা এই তিন কাজেই তিনি ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। নীরবে-নিভৃতে তিনি গবেষণা করেন নানা বিষয়ে। একদিকে ছাত্র গড়ায় তার পূর্ণ মনোযোগ, অন্যদিকে পরবর্তী প্রজন্মের আলোকবর্তিকা হিসেবে রচনা করে চলেছেন হাজার হাজার পৃষ্ঠা। তিনি চান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাঠদান ও লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকতে। ছাত্র গড়া এবং লেখা দুটি কাজই তিনি অত্যন্ত মমতার সঙ্গে করেন। তিনি মনে করেন, দুটি কাজই সদকায়ে জারিয়া (এমন দান, যার কার্যকারিতা কখনো শেষ হয় না। কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে)। নিয়তির ডাকে সাড়া দিয়ে একদিন সবাইকেই চলে যেতে হবে, তখন এগুলোই হবে পরকালের প্রধান অবলম্বন।
মুফতি হিফজুর রহমানের জন্ম ১৯৫৮ সালে কুমিল্লার লাকসামে। বাবার নাম মাওলানা মুহিব্বুর রহমান, মায়ের নাম রাজিয়া খাতুন। বাবা ছিলেন প্রখ্যাত আলেম। বাবা-মায়ের কাছেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি। বাবার আদর্শেই তিনি বেড়ে ওঠেন। পুরোপুরি দীনি পরিবেশে বড় হন। তবে তার প্রাথমিক পড়াশোনা স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী ছিলেন। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি লাভ করেন। ফেনী পাইলট স্কুলে সিক্সে ভর্তি হয়ে পুরো স্কুলে মেধা তালিকায় এক নম্বর হয়ে তাক লাগিয়ে দেন।
পারিবারিকভাবে দীনি আবহে বেড়ে ওঠার কারণে এক পর্যায়ে তিনি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। চট্টগ্রামের মেখল ও হাটহাজারী মাদ্রাসায় তিনি পড়াশোনা করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার সেই স্বর্ণযুগে প্রখ্যাত মনীষীদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি দাওরায়ে হাদিসে উত্তীর্ণ হন। ক্লাসে বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করতেন। তার প্রতিভার নামডাক ছিল পুরো মাদ্রাসাজুড়ে। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে জামিয়া বিন্নুরি টাউনে ফিকাহ শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন। সান্নিধ্য লাভ করেন প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আবদুর রশিদ নোমানীর। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের কারণে তিনি ফিকাহ শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে পাঠদান ও লেখালেখিতে সেটার ছাপ ফুটে ওঠে। ইলমি বিষয়াদির ওপর লেখা শত শত কিতাব তিনি পাঠ করেন। এজন্য তার লেকচার ও লেখনীতে অগণিত কিতাবের রেফারেন্স পাওয়া যায়। প্রখর স্মৃতিশক্তির কারণে এসব কিতাবের নাম ও বিষয়বস্তু তার নখদর্পণে থাকে। শত শত কিতাবের সারনির্যাস তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে চমৎকারভাবে তুলে ধরেন। কর্মজীবনের একটি বড় অংশ তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়ায় প্রধান মুফতি ও সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে কাটিয়েছেন। পড়িয়েছেন আরও কয়েকটি মাদ্রাসায়। বর্তমানে প্রধান মুফতি ও সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে মোহাম্মদপুরের বছিলার জামিয়া রাহমানিয়া আজিজিয়ায় কর্মরত।
মুফতি হিফজুর রহমানের আরবির চর্চাটা সেই ছাত্রজীবন থেকেই। তিনি যখন মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করেন তখনই আরবিতে পরীক্ষা দিতেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ফিকাহ শাস্ত্র গবেষণাকালে তার আরবি লেখালেখিতে জোয়ার আসে। সেই সময় ইসলামি আইনগ্রন্থ হেদায়ার ভূমিকা লেখেন আরবি ভাষায়, যা পরবর্তী সময়ে ‘মা ইয়ামবাগি বিহিল ইনায়া লিমান ইতালিউল হিদায়া’ নামে প্রকাশিত হয়। পরে তিনি বাংলা ভাষায়ও বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। বাংলা ভাষায় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো- সুদ ধ্বংস ও শোষণের হাতিয়ার, রাসুল (সা.) কি আলিমুল গায়িব, রহমতে আলম (সা.) এর মকবুল দুআ, কাদিয়ানী মতবাদ ও উলামায়ে ইসলাম, অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও মিল্লাতে মুসলিমা, সেবার আড়ালে এনজিওরা কী করছে ইত্যাদি। ইতিমধ্যে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বাংলা ও আরবিতে প্রায় ৭০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে ১৯টি আরবি ভাষায়।
দশ বছর পরিশ্রম করে তিনি আরবি ভাষায় ২৩ খণ্ডের প্রামাণ্য জীবনী বিশ্বকোষ তৈরি করেন। কায়রোর দারুস সালিহ প্রকাশনী থেকে ‘আল-বুদুরুল মাজিয়া ফি তারাজিমিল হানাফিয়া’ নামে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের বহু উলামা-মাশায়েখের বর্ণাঢ্য জীবনসাধনা ও অবদান এতে স্থান পেয়েছে। মিসরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলায় এই বিশ্বকোষ পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফিকহি পরিভাষার ওপর তার চার খণ্ডের আরেকটি গবেষণাগ্রন্থ পাঠকসমাদৃত হয়েছে। প্রতি খণ্ডে রয়েছে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা। যারা হাদিস ও ফিকহের ওপর বিশেষ কোর্স করে থাকেন, তাদের জন্য এটি একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া তিনি বাংলাভাষী দুই হাজার কীর্তিমান মনীষীর জীবন, কর্ম, সাধনা ও অবদান নিয়ে আরেকটি জীবনীকোষ তৈরি করেন আরবি ভাষায়। ২০২০ সালে আট খণ্ডে এটি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে বাংলাভাষী ২১৮৩ জন মনীষীর অমূল্য জীবনকথা। প্রায় চার হাজার পৃষ্ঠার যুগান্তকারী এই গ্রন্থের নাম ‘আল-ইয়াওয়াকীতু ওয়াল জাওয়াহির ফি তারাজিমি নুবালায়ি বাংগাল ওয়াল আকাবির।’ ছয় বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে রচিত হয় এই জীবনীকোষ। গ্রন্থটিতে অভিমত দিয়েছেন বিশ^বিখ্যাত কয়েকজন ফকিহ ও আলেম স্কলার।
আরবিতে আরও তিরিশটির বেশি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন তার পূর্ণ মনোযোগ আরবি রচনা ও গবেষণার দিকে। তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষায় লেখার জন্য প্রচুর লেখক আছেন। এজন্য তিনি চান আরবি ভাষায় বাংলাকে বিশ^দরবারে তুলে ধরতে।
শিক্ষকতা ও লেখালেখিতে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে মুফতি হিফজুর রহমান বলেন, ‘আমি মনে করি লেখালেখিটা দীর্ঘস্থায়ী। আগেকার ইমামরা যেমন ইমাম বোখারি (রহ.) ১২০০ বছর আগে লিখেছেন, এমনিভাবে ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শাফী রাহিমাহুমুল্লাহ- তারাও লিখে গেছেন। তাদের লেখা ১২-১৩শ বছর পরও আমরা পড়ি। এই দীর্ঘ সময় মানুষ তাদের লেখার দ্বারা উপকৃত হয়েছে, আরও হবে। তাই লেখালেখিকে সদকায়ে জারিয়া ও দীর্ঘস্থায়ী খেদমত মনে করি। পাশাপাশি পড়ানোটাও এক অর্থে দীর্ঘস্থায়ী খেদমত। কারণ, একজন ছাত্রকে যখন শেখাই, সে অন্যকে শেখাবে, সে আবার অন্যকে। এভাবে পড়ানোর মাধ্যমেও যুগ যুগ ধরে খেদমত জারি রাখা যায়।
আরবি কোরআন-হাদিসের ভাষায়। জান্নাতের ভাষা আরবি। আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর ভাষাও ছিল আরবি। একজন মুসলমান হিসেবে প্রত্যেকের আরবির প্রতি ভালোবাসা থাকা ইমানের দাবি। এছাড়া বাংলাদেশিদের জন্য আরবি ভাষা চর্চায় বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের দেশের লাখ লাখ শ্রমিক কর্মরত। আরবি জানা থাকলে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের মাধ্যমে তারা দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ভূমিকা রাখতে পারেন। সর্বোপরি একটি দেশের ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অনুবাদ সাহিত্য এবং বিদেশি ভাষা চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের ভাষা আরবিতে বাংলাকে রূপান্তর অত্যন্ত জরুরি। আর এই কাজটিই মুফতি হিফজুর রহমান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার এই কর্মতৎপরতা অব্যাহত থাকুক, আরও ব্যাপক পরিসরে তিনি যেন দীনের খেদমত চালিয়ে যেতে পারেন- সেই দোয়া ও প্রত্যাশা রইল।