কমছে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে পশ্চিমে

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:২৩ এএম

১৯৭৬ সালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন ও লিবিয়ায় ৬ হাজার ৮৭ জনকে পাঠানোর মাধ্যমে দেশের প্রবাসী কর্মসংস্থানের যাত্রা শুরু। ওই সময় থেকেই প্রবাসী আয়ের প্রধান অঞ্চল হিসেবে ধরা হয় মধ্যপ্রাচ্যকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর প্রবাসী আয়ের গতিপথে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। আর সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে পশ্চিমা দেশ। শীর্ষ স্থানে থাকা সৌদি আরবকে ডিঙিয়ে চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী প্রবাসীরা বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়ে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছেন। তুলনামূলক কম প্রবাসীর দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আয় বেড়ে যাওয়া স্বস্তি দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হঠাৎ হুন্ডির প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এরপরই অবস্থান সৌদি আরবের। অথচ গত দশ বছরে কখনো প্রবাসী আয়ে সৌদিকে পেছনে ফেলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় (১০৭ টাকা দরে) যা ২১ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। বিপরীতে সৌদি আরব থেকে আলোচিত সময়ে এসেছে ১৯০ কোটি ৯১ লাখ ডলার বা ২০ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। শুধু সৌদি নয়, একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোরও।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর পরিবেশ রয়েছে। যে কারণে হুন্ডির পরিমাণ বাড়ছে। এতে দেশে রেমিট্যান্স কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের আয় কম। বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠালে তারা ১০৭-৯ টাকা পাচ্ছে। অথচ হুন্ডিতে পাঠালে পাচ্ছে ১১৫-১৮ টাকা। তাই তারা হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছে।

পশ্চিমা দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স বাড়ার কারণ জানতে চাইলে সাবেক গভর্নর বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে কেউ হঠাৎ করে অনেক ডলারের মালিক হয়ে গেলে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে সেখানে হুন্ডির কারবারিরা সুবিধা করতে পারছে না। এ ছাড়া ওই দেশগুলোতে যাওয়া বাংলাদেশিদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও সচেতন। তাই তারও রেমিট্যান্স হুন্ডিতে কম পাঠায়।

অসমর্থিত সূত্র মতে, অর্থ পাচারকারীরা হুন্ডির মাধ্যমেই পাচার করছে দেশের অর্থ। এজন্য তারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হুন্ডি এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে। এমনকি কয়েকটি বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নিয়োগ করা রেমিট্যান্স কর্মকর্তারাও হুন্ডি এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০২১ সালের শেষে মোট প্রবাসী বাংলাদেশির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ ১২ হাজার ১৯২ জন। ২০২২ সালে গিয়েছেন ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ কর্মী। আর গত ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) গিয়েছেন ৫ লাখ ২০ হাজার ৩৫৫ জন। করোনার কারণে ২০২১ সালে অনেক দেশে কর্মী পাঠানো বন্ধ ছিল। বিপরীতে বিপুলসংখ্যক কর্মী দেশে ফিরেছে। গত বছর আবারও প্রচুর পরিমাণ জনশক্তি বিদেশে গেলেও প্রবাসী আয়ে এর প্রভাব পড়েনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা চলাকালে হুন্ডিসহ অবৈধ লেনদেনের সুযোগ কমে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়েই বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। কিন্তু গেল বছর করোনার প্রকোপ না থাকায় আবারও অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে দেশে প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে। তবে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতায় হুন্ডি কিছুটা কমেছে। এতে বাড়ছে প্রবাসী আয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় এসেছিল ৪৫৪ কোটি ডলার। আর আগের চার অর্থবছরে দেশটি থেকে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ যথাক্রমে ৫৭২ কোটি, ৪০১ কোটি, ৩১১ কোটি ও ২৫৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের চেয়ে আগের ৫ বছরই সৌদি থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল।

এ ছাড়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৪৩ কোটি ডলার। এর পরের অর্থবছরগুলোতে যথাক্রমে ২৫৪ কোটি, ২৪৭ কোটি, ২৪৩ কোটি, ২০৭ কোটি ডলার এসেছে। আর চলতি অর্থবছর দেশটি থেকে এসেছে ১৩৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রতিনিয়তই দেশটি থেকে প্রবাসী আয় কমছে।

প্রবাসী আয় পাঠানোর দিক থেকে শীর্ষ পাঁচে থাকা আরেকটি দেশ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েত। দেশটি থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছিল ১২০ কোটি ডলার। এর পরবর্তী বছরগুলোতে যথাক্রমে ১৪৬ কোটি, ১৩৭ কোটি, ১৮৮ কোটি ও ১৬৮ কোটি ডলার।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমলেও বাড়ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে কয়েকগুণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৯৯ কোটি ডলার। পরের অর্থবছরে এর পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি ডলার। এরপর হু হু করে দেশটি থেকে বেড়েছে প্রবাসী আয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীরা ২৪০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়। পরের অর্থবছর ২০২০-২১-এ ৩৪৬ কোটি, ২০২১-২২-এ ৩৪৪ কোটি আর চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই দেশটি থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৯৭ কোটি ডলার।

একই অবস্থা ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্যেরও। দেশটি থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১১০ কোটি ডলার। পরের অর্থবছরেগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যথাক্রমে ১১৭ কোটি, ১৩৬ কোটি, ২০২ কোটি, ২০৩ কোটি ডলার দাঁড়িয়েছে। আর সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসেই দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১০০ কোটি ডলার।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশির পরিমাণ ৪৩ লাখ ৫৫ হাজার ৪০৮ জন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩ লাখ ৭৭ হাজার ২০৭ জন। এ ছাড়া কুয়েতে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৭২৪, ওমানে ১৫ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৩, কাতারে ৮ লাখ ১৩ হাজার ৭১৬ এবং বাহরাইনে ৪ লাখ ১০ হাজার ৪৭২ জন প্রবাসী বসবাস করেন। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে  (স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য) ১০ লাখ ৪২ হাজার ৭১০, যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ১৪৭, ইতালিতে ৫৫ হাজার ৫৯১ ও অন্য দেশগুলোতে ২ লাখের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত