‘জয় বাংলা’ পুনরুদ্ধার করেছে শাহবাগের গণজাগরণ

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:১৯ এএম

এক. আমার শৈশব-কৈশোরের পুরোটাই অতিবাহিত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবিতে। নোয়াখালী জিলা স্কুলে পড়ার কথা মনে পড়ে, ক্লাস সেভেনে থাকতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে পোস্টার লাগাতে গিয়ে স্কুল কর্র্তৃপক্ষের রোষানলে পড়তে হয়েছে। ছাড়পত্র (টিসি) দেওয়ার বন্দোবস্তও ছিল সেই রোষানলে। মফস্বলের একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও লেখক হিসেবে দেখতে হয়েছে, প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের মর্মমূলে কীভাবে আঘাত করে চলেছে একটি অপশক্তি।

দুই. ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এই রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সেদিন বিকেলে কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট শাহবাগে জড়ো হয়। প্রথমে কয়েকজন ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট শাহবাগে জড়ো হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই ভিড় বাড়তে থাকে। অনলাইনে অব্যাহত প্রচারণায় ধীরে ধীরে মানুষের স্রোত জনসমুদ্রে রূপ পেতে থাকে।

তিন. বিকেলে পল্টনে একটা মিটিং ছিল। তখন আমি যুব ইউনিয়ন ঢাকা মহানগরের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়আমরা শাহবাগের আন্দোলনে সংহতি জানাব। মিটিং সেরে বাসায় এলাম। এরই মধ্যে আমার ফুফাতো ভাই অধ্যাপক ডক্টর আবদুল জব্বার খান (বর্তমানে বুয়েটের উপ-উপাচার্য) জানালেন, শাহবাগে যাচ্ছেন তিনি। আমরা ঘরে থাকার কোনো চিন্তাই করলাম নাতিন ভাই শাহবাগে চলে গেলাম। সেøাগানে-সেøাগানে একাত্ম হয়েছি। ছোট ছোট মোমবাতি নিয়ে স্লোগানে গলা মেলালাম। পোস্টার লিখতে বসেছি।

সেদিন রাতের কথা, বিএসএমএমইউর সামনে রাস্তায় বসে এক বৃদ্ধ মহিলা। তার সামনে ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’ লেখা একটি কাগজ। চোখ বন্ধ করে তিনি জপে যাচ্ছেন কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই..., কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই...। কেউ একজন তাকে ভিক্ষুক ভেবে তার দিকে কুড়ি টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এই নিন। তিনি চোখ খুলে তাকালেন। বললেন, এটা কী? ওই ভদ্রলোক বললেন, টাকা। বৃদ্ধা বললেন, আমি দুইশ টাকা ধার করে এখানে আসছি, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাইতে। জানি আপনার টাকা নেব কেন?

এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আমাদের উৎসাহিত করেছে।

চার. বুকের মধ্যে একটা আগুন ছিলবারুদ-জ্বলা আগুন। কেমন করে যেন সেদিন বারুদ জ্বলে উঠল, মুহূর্তে টেনে নিয়ে গেল মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনিওই সময় বেঁচে থাকলে নির্ঘাত যুদ্ধে যেতামআবেগটা সেই লেভেলের ছিল। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনিকিন্তু আমাদের প্রেরণা ছিল মহান স্বাধীনতা-সংগ্রামের লাখো শহীদের রক্তস্নাত স্বপ্ন, বিশ্বাস আর আত্মত্যাগ।

শাহবাগের গণজাগরণ শুধু নিছক আন্দোলন ছিল না। নানা মাত্রিকতার মিথস্ক্রিয়া তৈরি করেছিল সেই আন্দোলন। একদিকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিল এ আন্দোলনে, অন্যদিকে ছাত্র-যুবদের শ্রেষ্ঠতম আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আর বৌদ্ধিক আন্দোলনেও ‘শাহবাগ’ নতুন মাত্রা তৈরি করে গেছে।

এ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা আছে, সমালোচনাও আছে। কিন্তু এ আন্দোলনের প্রেক্ষিত সর্বজনীন। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ শব্দটি বেহাত হয়ে গিয়েছিল। জয় বাংলাকে শাহবাগের গণজাগরণের মাধ্যমে অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব শক্তিকে একত্র করার ক্ষেত্রে সফল প্রেক্ষাপট গণজাগরণ মঞ্চ। দীর্ঘ সময় ধরে একটি অহিংস আন্দোলন করতে পারা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগের প্রবল বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তা সমাজের বৃহত্তর অংশকেও বেশ আলোড়িত করে। একপর্যায়ে শাহবাগ চত্বরে বিপুলসংখ্যক মানুষের সপরিবারে উপস্থিতি লক্ষ করা যায়; নারী ও শিশুদের উপস্থিতিও ছিল ব্যাপক। আন্দোলন ছিল গানে, কবিতায়, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত।

এ ছোট্ট জীবনে এ আন্দোলন সব সময় স্মরণীয়। গর্বিত হইএ আন্দোলনে আমি একজন সাধারণ কর্মী ছিলাম। এক দিন হয়তো বড় করে ইতিহাস হবে ‘শাহবাগের গণজাগরণ’। সেদিন স্পন্দিত বুকে বলতে পারবআমিও গণজাগরণে অংশ নিয়েছিলাম, সেই জাগরণ আমাকেও জাগিয়ে দিয়েছিল।

পাঁচ. ওই সময়গুলোতে প্রচুর ঝড় গেছে আমাদের ওপর। প্রতিনিয়ত আমাদের আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। আমাদের অনেক সহযোদ্ধা নিরাপত্তাহীনতায় ছিল। বিভিন্ন হুমকির শিকার হতে হয়েছে। তবুও দুর্বিনীত ছিল। ভেঙে পড়েনি। লড়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। তাদের শ্রদ্ধা জানাই, সম্মান জানাই। মাঝে মাঝে আমাদের ঠিকানা বদল করতে হয়েছে। তবুও আমরা কাঁধে কাঁধ রেখে ছিলাম। পালিয়ে যাইনি।

ছয়. শাহবাগ চত্বরপুরান ঢাকা থেকে নতুন শহরের দিকে আসা অজস্র বাস, গাড়ি, রিকশা জমে থাকে। ভিড় একটু হালকা হলে চোখে পড়ে, রাস্তার প্রস্থজুড়ে সাদা রঙ দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখাগণজাগরণ মঞ্চ। রঙ ফিকে হয়ে গিয়েছে। এই সেই চত্বর, যেখানে ১০ বছর আগে লক্ষাধিক মানুষ বহু দিন কাটিয়েছেন। তাদের আন্দোলন পুরো পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছে। আজ কোথায় সেই আন্দোলনের গতিপথ? তবে কি রাস্তাজোড়া বর্ণমালার সাদা রঙের মতোই আন্দোলনও ফিকে হয়ে গেল? নাকি, আপাতত আগামী বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে?

গ্রামের মানুষদের কাছে শাহবাগ আন্দোলন তেমন কোনো বড় বিষয় নয়। শহরের গরিব মানুষও যে এর সঙ্গে খুব বেশি একাত্ম হয়েছিলেন, এমন নয়। কিন্তু এটা যদি আন্দোলনের ব্যর্থতা হয়, তবে এক অর্থে এটাই তার সাফল্যের চাবিকাঠি। বস্তুত, মুক্তিযুদ্ধের পরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ ধরনের ঐক্য আর কখনো সামনে আসেনি।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি হাতেগোনা ‘১০ থেকে ২০ জন’ নিয়ে যে আন্দোলনের শুরু, কেমন করে কয়েক ঘণ্টায় হাজার, কয়েক দিনে হাজার পেরিয়ে লাখে পৌঁছাল, তা ইতিহাস। এবং তারা কারা? যারা বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম, ভবিষ্যতের কারিগর। শাহবাগ ব্যর্থ না সফল, তা সময়ই বলবে। কিন্তু বুঝতে পারি যে, আমাদের প্রত্যেকের মনে একটা করে শাহবাগ তৈরি হয়ে গিয়েছে। প্রয়োজন হলেই আবার সেই লুকোনো শাহবাগ বেরিয়ে আসবে।

আন্দোলনের গোড়ার দিকে প্রায় কুড়ি দিন ও রাত একটানা শাহবাগে জমায়েত করেছিলাম। সে একটা অদ্ভুত অবস্থা। হাজার হাজার স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রী, সাধারণ মানুষ রাস্তায় বসে আছে। কী খাবে, কোথায় থাকবে, কোনো চিন্তা নেই। শুধু সুনির্দিষ্ট দাবি পূরণ চাই। কিন্তু এমন করে তো বেশি দিন চলতে পারে না। অনেকে বাইরে থেকে চাকরি ছেড়ে, দোকান ফেলে এসেছেন। জানেন না চাকরি রইল কি না, দোকান কী অবস্থায়। সাধারণ মানুষ তো এগিয়েছে। ভাবা যায়, শাহবাগের জমায়েতে যাবে শুনলে রিকশাচালকও সওয়ারির কাছ থেকে ভাড়া নিতে চাননি। বিনা পয়সায় গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন!

সাত. এটা মানতে হবে, একটা সময়ে গণজাগরণ মঞ্চে বিভেদ তৈরি হয়েছে। তার কারণও আছে। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে বিভিন্ন ধরনের মানুষ এসেছেন। এখানে দায়বদ্ধতা মেটাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মানুষ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনসবাই এসেছেন। যারা এসেছিলেন, তাদের একটাই ইস্যু ছিল, যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক জায়গা থেকে যারা এসেছিলেন, তাদের প্রত্যেকের দলীয় রাজনীতির একটা যুক্তি ছিল। তিনি যখন দেখছেন, তার চিন্তাধারার সঙ্গে শাহবাগ ক্ল্যাশ করছে, তখন তিনি সরে গেছেন। তবে শাহবাগ আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে সরকার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে গণজাগরণ মঞ্চের বিভেদগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। তবে, যে চেতনাকে ধারণ করেছে শাহবাগ, সে চেতনা আজও প্রদীপ্ত কোটি বাঙালির হৃদয়ে। ১০ বছর আগের শাহবাগের গণজাগরণ সেই শক্তির ডাক দেয়।

লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত