পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বিখ্যাত ফুরফুরা শরিফকে ভাবা হয় আজমির শরিফের পর ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী দরবার শরিফ। বাংলাদেশ ও ভারতে ফুরফুরা শরিফের প্রচুর হিন্দু-মুসলিম ভক্ত রয়েছে। ফুরফুরা শরিফ মূলত সামাজিক সেবামূলক কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকলেও দরবারের বর্তমান পীরজাদারা রাজনীতির মাঠে বেশ সক্রিয়।
দরবারের প্রয়াত ছোট হুজুরের নাতি আব্বাস সিদ্দিকী প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামে রাজনৈতিক দল। দল গঠনের পর গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতার সঙ্গে আসন ভাগাভাগির চেষ্টা করেছিলেন আব্বাস সিদ্দিকী। যদিওবা শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের সঙ্গে সংযুক্ত মোর্চায় যায় দলটি। আব্বাস সিদ্দিকীর ভাই নওশাদ সিদ্দিকী সে জোটের হয়ে নির্বাচন করে রাজ্যের বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমানে কলকাতার রাজনীতির মাঠ সরগরম নওশাদ সিদ্দিকীর গ্রেপ্তার নিয়ে। মূলত ভাঙড়েতে (নওশাদ সিদ্দিকীর আসন) দলীয় পতাকা লাগানোকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও সেক্যুলার ফ্রন্টের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। সে সংঘর্ষের জেরে কলকাতায় সমাবেশ হলে সেখান থেকে নওশাদ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। নওশাদ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তারের পর পীরজাদারা সম্মিলিত প্রতিবাদের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া, এ ঘটনায় অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এর মধ্যে কৌতূহল জোগায় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি নওশাদ ভাইয়ের মুক্তি দাবি করছি’। ২০২১-এ আব্বাস সিদ্দিকীরা যখন রাজনীতিতে এসেছিলেন তখন দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ‘আমার যদি নির্বাচনে লড়াই করার অধিকার থাকে, তবে আব্বাস সিদ্দিকীরও রয়েছে।’ বিজেপির মুসলমানদের রাজনৈতিক দল গঠনকে উৎসাহ এবং মুসলিম নেতাদের মুক্তির দাবি করার এই কৌশলের বিশেষ রাজনীতি রয়েছে।
ভারতের যে কটি প্রদেশের নির্বাচনে মুসলিম ভোট ফ্যাক্টর তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ একটি। পশ্চিমবঙ্গের প্রতি তিনটি ভোটের একটি ভোট মুসলিম ভোট। দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটি’র মতে, ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দু ভোটের ৫০ শতাংশ পেয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে মুসলিম ভোটের ৭৫ শতাংশ পড়েছে তৃণমূলের বাক্সে। ফলে আর কিছুটা হিন্দু ভোট বাড়াতে পারলে এবং মুসলিম ভোট বিভক্ত করতে পারলে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাসন করার স্বপ্ন পূর্ণ হতে পারে। মুসলমান ভোট বিভক্ত করে বিজেপির জেতার এই কৌশল বেশ কটি রাজ্যে বেশ সফল হয়েছে।
আসামের মুসলমানদের রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ)। দলটি ২০১৬ সালের আসাম বিধানসভায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করে। ফলে মুসলিম ভোট কংগ্রেস থেকে সরতে শুরু করে। মুসলিম ভোটের এই বিভক্তির ফলাফল যায় বিজেপির ঘরে। ২০১৬ সালের আসাম বিধানসভায় জয়লাভ করে আসামে সরকার গঠন করে বিজেপি, অথচ আসাম রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। আসামে মুসলিম ভোটের বিভক্তি বিজেপির জয়কে সহজ করে দেয়। আসামের সে ফর্মুলা পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়ন করতে চায় বিজেপি।
নওশাদ সিদ্দিকীর দল ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’ যতই মমতার মুখোমুখি দাঁড়ায় ততই বিজেপির সুবিধা। কারণ একচেটিয়া (৭৫ শতাংশ) মুসলিম ভোটপ্রাপ্তি মমতাকে সর্বশেষ বিধানসভায় জয় এনে দিয়েছে। আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনের আগে ও ২০২৬-এর পরবর্তী বিধানসভাকে সামনে রেখে মমতার সঙ্গে মুসলিম কমিউনিটির দূরত্ব তৈরি করতে পারলে বিজেপির জেতার একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভারতের ৫৩০ লোকসভা আসনের মধ্যে অন্তত ১০০ লোকসভা আসনে মুসলমান ভোট ম্যাটার করে। তাই শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা আসাম নয় সারা ভারতের যেসব জায়গা মুসলিম ভোট ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে, সেসব জায়গায় বিজেপি এই কৌশল নিয়েছে।
উত্তর প্রদেশের ২৪ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম, অর্থাৎ সাড়ে চার কোটি মুসলমানের বাস উত্তর প্রদেশে। তুরস্কের পর সবচেয়ে বেশি মুসলিম বাস করে উত্তর প্রদেশে। অথচ বর্তমান সরকারে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য হলেও মুসলিম সম্প্রদায় থেকে কোনো বিধায়ক নেই। মুসলিম ভোট বিভক্তি করে মাত্র ২০১৭ সালে বিজেপি উত্তর প্রদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। সেবার ৪০৩টি বিধানসভা সিটের মধ্যে ৩২২টিতে জিতেছিল বিজেপি অথচ তাদের পপুলার ভোট ছিল ভোটের ৪০ শতাংশ। কীভাবে সাড়ে চার কোটি মুসলিম জনসংখ্যাকে পাশ কাটিয়ে বিজেপি নিরঙ্কুশ হিন্দু সরকার গঠন করছে উত্তর প্রদেশে! বিশ্লেষণ বলে দেয়, মুসলিম ভোট বিভক্তির কৌশলই বিজেপিকে নির্বাচন জিতিয়ে এনেছে।
বর্তমান উত্তর প্রদেশ সরকারের ৪০৩টি বিধানসভার সিটের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২৭৪টি, যা গতবারের চেয়ে ৪৮টি কম। আর বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি জিতেছে ১২৪ আসন, যা গতবারের চেয়ে ৭২টি বেশি। ২৭৪টি আসনে জয় পাওয়া বিজেপির পপুলার ভোট ৪৫ শতাংশ আর ১২৪ আসন পাওয়া সমাজবাদী পার্টির পপুলার ভোট ৩৬ শতাংশ আবার মাত্র ১ আসন পাওয়া বহুজন সমাজবাদী পার্টির (বিএসপি) পপুলার ভোট ১৩ শতাংশ। কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে সমাজবাদী পার্টি ও বিএসপির মোট পপুলার ভোট হয় ৪৯ শতাংশ, যা বিজেপির চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি। অথচ তাদের আসনসংখ্যা হয় ১২৫টি, যা বিজেপির চেয়ে ১৪৯টি কম।
জওয়াহেরলাল নেহরুর জন্মভূমি উত্তর প্রদেশের বিধানসভায় কংগ্রেস কোনো সমীকরণে নেই। রাজ্যটি দীর্ঘদিন শাসন করেছে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও মায়াবতির বহুজন সমাজ পার্টি। দু-দলই বিজেপির বিরোধিতা করলেও তাদের মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য নেই। গত বিধানসভা নির্বাচনে মায়াবতির বহুজন সমাজবাদী পার্টি ৪০৩ জনের মধ্যে ১১৩ জন প্রার্থী দেয় মুসলিম কমিউনিটি থেকে। অখিলেশ যাদবের দল থেকে দাবি করা হয়, ‘বিজেপির বি টিম হয়ে কাজ করেছে বিএসপি, মূলত সমাজবাদী পার্টি থেকে মুসলিম ভোট সরিয়ে বিজেপিকে সুবিধা দিতে মায়াবতী এতজন মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন।’ বিজেপি থেকে মাত্র ৯ শতাংশ পপুলার ভোট কম পাওয়া অখিলেশ যাদবের এমন আক্ষেপ থাকতেই পারে।
তবে সে নির্বাচনে হায়দ্রাবাদের আসাদউদ্দীন ওয়াইসির দল অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) গিয়েও হাজির হয়। তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র ও বিহারের বিধানসভায় আসন পাওয়ার পর দলটি উত্তর প্রদেশেও লড়াই করে। কোনো আসন জিততে না পারলেও বেশ কিছু মুসলিম ভোট বাক্সে পেয়েছিল, যা হয়তো পড়ত সমাজবাদী পার্টির বাক্সে। সমাজবাদীর এই আক্ষেপ আরও তীব্র হয় যখন দেখা যায় তাদের প্রার্থী অনেক আসনে হাজারেরও কম ভোটে বিজেপির প্রার্থীর কাছে হেরেছে। এভাবে এমআইএম, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসে বিভক্ত হয়ে যায় ২০ শতাংশ মুসলিম ভোট। বিরোধীদের এমন বিভক্তি মূলত বিজেপিকে সহজ ও নিরঙ্কুশ জয় এনে দেয়।
মুসলিমদের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে দিলীপ ঘোষদের আরও নানা ধরনের সমীকরণ রয়েছে। মুসলিমদের সেক্যুলার রাজনীতি থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের দিকে ঠেলে দিতে পারলে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা হয়। এতে বিজেপি সমর্থকদের গরম বক্তব্য দিয়ে উজ্জীবিত রাখার সুযোগ পাওয়া যায়। মুসলিমদের বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত ও চিহ্নিত করা যাবে। অন্যদিকে কংগ্রেস ও বিজেপি বিরোধী দলগুলোর মুসলিম ভোটের কাঁধে সাঁকো পার করাও বন্ধ করা যাবে।
ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুদের কট্টরতার উদাহরণ দিয়ে মুসলমান দলের জনপ্রিয়তা বাড়ানো এবং মুসলমানদের কট্টরতার উদাহরণ দিয়ে হিন্দু দলের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর এক ধরনের কৌশলও রয়েছে। হায়দ্রাবাদের মুসলিম রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) দলটি বেশ পুরনো। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির মুসলমান বিরোধিতাকে কাউন্টার করে দলটি সারা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকরা বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম না হলে বা পাকিস্তান ও ভারত জিন্নাহর ঘোষণা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মতো বন্ধুবৎসল প্রতিবেশী হলে বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় বসতে পারত না। (জিন্নাহর তথ্যসূত্র শশী থারুর, ২০১৮)। এখনো পাকিস্তানের জেনারেলের এক একটা হুমকি ভারতে হু হু করে বিজেপির ভোট বৃদ্ধি করে।
ভারতে মুসলমানদের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনও সেক্যুলার ভারতের জন্য সুখকর নয়। কারণ রাজনীতি ও ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। রাজনীতি বলে ক্ষমতার কথা, ধর্ম বলে বিশ্বাসের কথা। ক্ষমতার জাঁতাকলে প্রায়ই বিশ্বাস ধামাচাপা পড়ে যায়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে জনগণ ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করতে পারে না। ফলে ধর্মের আবেগে তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায়শই যৌক্তিকভাবে নিতে পারে না। এই যুক্তি ও আবেগের মাঝখানে ভারতের মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে কয়েক গ্রুপে। এই ভাগাভাগি মমতার তৃণমূল কংগ্রেস, অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি বা রাহুল গান্ধীর জাতীয় কংগ্রেসের মুসলিম ভোটব্যাংকের নিরঙ্কুশতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিচ্ছে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট
