নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে?

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:২০ পিএম

নতুন শিক্ষাক্রমে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে শিখনকালীন মূল্যায়ন, যেটি প্র্যাকটিক্যাল টিচিং লার্নিংয়ের কথাই বলে। একটি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা ভারতের হিন্দি ফিল্ম আর সিরিয়াল দেখে হিন্দি কথা বলতে পারেন এবং হিন্দি বোঝেন। যদিও তারা হিন্দি অক্ষরের সঙ্গেও পরিচিত নন, হিন্দি বিদ্যালয়ে পড়েননি, শিক্ষকদের সহায়তা নেননি, কোনো পরীক্ষাও দেননি। শুধু ভারতীয় ছবি দেখেই হিন্দি শিখে ফেলেছেন। ইংরেজির ক্ষেত্রে হয়েছে পুরোপুরি উল্টো। আমরা দীর্ঘ বারো বছর বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি পড়াচ্ছি। শুধু কি পড়াচ্ছি? তারা কোচিং করছে, ক্লাস করছে, প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, বোর্ড থেকে ইংরেজিতে একটি গ্রেড নিয়ে পাস করছে কিন্তু ইংরেজি না পারছে বলতে, না পারছে বুঝতে, না পারছে নিজ থেকে দু-চার লাইন লিখতে (ব্যতিক্রম দু-চারজন ছাড়া)। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বেশির ভাগ মূল্যায়ন হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে। অর্থাৎ বিষয় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সারা বছর ধরে অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক কাজ, প্রকল্পভিত্তিক শিখনচর্চা, খেলাধুলা, গ্রুপ ওয়ার্ক, কুইজ, পোস্টার প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করাবেন এবং তাদের কাজের মূল্যায়ন করবেন। মূল্যায়ন মানে বর্তমানকালের মতো প্রচলিত পরীক্ষা নয়, নম্বর নয়, গ্রেডিং নয়। নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে সে সম্পর্কে শিক্ষক মন্তব্য করবেন। মন্তব্যগুলো হবে’ খুব ভালো, ভালো, সন্তোষজনক এবং আরও শেখা প্রয়োজন, এ ধরনের। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শ্রেণিতে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া বা নম্বর ও গ্রেডিংয়ের পেছনে ছোটার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সেটি থাকবে না। এখানে শিক্ষকের ভূমিকাই হবে মুখ্য। তাদের বহুমাত্রিক সৃজনশীল, দক্ষ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও মানবিক গুণসম্পন্ন আদর্শ শিক্ষক হতে হবে। সহপাঠীরাও তাদের সতীর্থদের মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে। যেমনপ্রকল্পভিত্তিক শিখনচর্চায়’ একজন শিক্ষক তার শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে প্রকল্পভিত্তিক শেখার কাজ দেবেন। কাজটি করার পর শিক্ষার্থীরা তা শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপন করবে। তার ভিত্তিতে শিক্ষক মূল্যায়ন করবেন। আবার দলের ভেতরে থেকেও শিক্ষার্থীরা একে অপরের কাজ মূল্যায়ন করতে পারবে। এগুলো সবই চমৎকার কথা! কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া কারিকুলামের বই তিন বছরেরও অধিক সময় ধরে বের হলো, কিন্তু প্রতিটি বইয়ে ভূরি ভূরি ভুল বের হচ্ছে। ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। যেকোনো কাজ করতে গেলে ভুল কিছুটা হবেই। গত বছর বইগুলোর ওপর পাইলটিং হয়েছে, বহুবার পত্রিকায় লিখেছি, পাইলটিংয়ের ফলাফল জাতির সামনে পেশ করতে যাতে সংশ্লিষ্টদের ফিডব্যাক নিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে কম ভুলসহ বইগুলো তুলে দেওয়া যায়। কিন্তু তা ঘটেনি। এখন সব শিক্ষার্থীর কাছে বই পৌঁছায়নি, সব বিষয়ের বইও পৌঁছায়নি অথচ ভুলে ভুলে একাকার। একজন রিডার এরই মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে ৪৮টি ভুল বের করেছেন। তবে, আমার আজকের লেখা ভুল নিয়ে নয়। আমার লেখা ইংরেজি বই কতটা আনন্দময় আর ইংরেজি ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে কতটা উপযোগী হয়েছে সেই বিষয়ে সামান্য একটু আলোকপাত করতে চাই।

মাতৃভাষার বাইরে অন্য কোনো ভাষা শেখাতে হলে সেই ভাষাতেই শেখানোর পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। তা না হলে শিক্ষার্থী বারবার তার মাতৃভাষায় ফিরে আসবে, বাধাগ্রস্ত হবে তার দ্বিতীয় ভাষাশিক্ষা। নতুন বইয়ে যেটি করা হয়েছে পুরো ইন্ট্রাকশন বাংলায় করা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষক ইংরেজি প্র্যাকটিস করবেন না। এটি ন্যাচারাল। তারা ইংরেজির দিকে তাকাবেনই না, তাহলে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি কোথা থেকে শিখবে? ইন্ট্রাকশনগুলো সব সময়ই ইংরেজিতে ছিল। এখন পাঠককে আনন্দময় করতে গিয়ে সব বাংলায় করা হলো, এ কেমন ভাষাশিক্ষার পদ্ধতি? আমরা তো আবারও গ্রামার ট্রানস্লেশন মেথডে ফিরে গেলাম। ইংরেজিতে যারা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তারা দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই বাংলায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তারা শিক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু ভাষা শেখার জায়গাটি কোথায়? এমনিতেই ক্লাসরুমের বাইরে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি প্র্যাকটিসের সুযোগ নেই বললেই চলে, ক্লাসরুম আর বই থেকে কিছুটা শিখবে। সেখানেও ইংরেজি শেখার সুযোগ সংকুচিত করা হলো।

আমাদের শিক্ষার্থীদের সমস্যা হচ্ছে, সিচুয়েশন সব জানা থাকলেও নিজ থেকে ইংরেজিতে  কিছু লিখতে পারে না, একইভাবে বলে প্রকাশ করতে পারে না যদিও তাদের পটেনশিয়াল আছে। অন্যের ইংরেজি শুনে, বিদেশিদের ইংরেজি শুনে বুঝতে পারে না, ইংরেজিতে লেখা কোনো বিষয় পড়ে বুঝতে পারে না শুধু নিজ টেক্সট বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু চ্যাপ্টার ছাড়া। ঘুরেফিরে তারা ওই কয়েকটি চ্যাপ্টার এবং প্যাসেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে, পাসের হার বাড়ছে প্রচুর কিন্তু ইংরেজি শেখার ধারে-কাছেও নেই দু-চারজন অনন্য ব্যতিক্রম ছাড়া। ইংরেজির এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমরা চিৎকার করছি, আবেদন করছি, লিখছি, টিচার সংগঠন করছি কারণ টিচারদের আগে এই প্র্যাকটিসগুলো করতে হবে, তা না হলে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।

কেউ কেউ বলছেন, নতুন কারিকুলামে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ে ব্যাপকভাবে  Task based language teaching theory  প্রয়োগ করা হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা সিএলটি মেথড, সঙ্গে জিটিম পদ্ধতিতে ইংরেজি শিখবে। গ্রামার ট্রান্সলেশন পদ্ধতি তো পুরনো, সেটি বাদ দিয়ে তো কমিউনিকেটিভ মেথড (সিএলটি) আমদানি করা হলো। দুই পদ্ধতির বেস্ট প্র্যাকটিসগুলো একসঙ্গে ব্যবহৃত হলে সেটিকে বলা হয় একলেকটিস অ্যাপ্রোচ। এটি কিন্তু কোনোটিই হয়নি। তাহলে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখার কী হবে? তারা আরও বলছেন, শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ভাষার চারটি দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে। সেটি কীভাবে? বলা হয়েছে, প্রথমবারের মতো ইংরেজি বই দুটোতে বাংলা যোগ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের বাংলার মাধ্যমে ইংরেজি শিখতে উৎসাহিত করার জন্য।

ইংরেজিতে সামেটিভ অ্যাসেসমেন্ট ও কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট দুটো পদ্ধতিতেই অ্যাসেসমেন্ট হবে। বলা হচ্ছে, সামেটিভ অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে রিডিং ও রাইটিং স্কিল আর কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে স্পিকিং ও লিসেনিং স্কিলসহ অন্যান্য স্কিল মূল্যায়ন করা হবে। এতে শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন করা হলো বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা এখন ক্রিটিক্যাল থিংকিং ডেভেলপ করতে পারবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ভাষায় বিশেষভাবে পিছিয়ে আছে, ইংরেজিতে কীভাবে তারা ক্রিটিক্যাল থিংকিং স্কিল উন্নত করবে? নতুন নতুন ভোকাব্যুলারি সব লেসনের প্রথমে আছে আর সবগুলোর অর্থ বাংলায় বইয়ের শেষে দেওয়া আছে। আসলে কোনো শব্দের অর্থ জানলেই ভোকাব্যুলারি উন্নত হয় না, শিক্ষার্থীরা যদি সেসব নতুন শব্দ ব্যবহার করে নিজেরা বাক্য তৈরি করতে না পারে।

সপ্তম শ্রেণির বইয়ে  ‘এ ড্রিম স্কুল’ নামক প্রথম চ্যাপ্টারটিতে দেখলাম আঠারোটি প্রশ্ন করা হয়েছে, সবগুলোই ‘ডু’ দিয়ে শুরু? এ কেমন ভাষাশিক্ষার ক্লাস, আর আনন্দই বা কোথায়? বিভিন্ন ধরনের সাহায্যকারী ক্রিয়া দিয়ে বাক্যগুলো গঠন করা যেত। দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘প্লেলিং উইথ ওয়ার্ডস’-এ ‘সাফিক্স’ আর ‘প্রেফিক্স’ বোঝানোর জন্য পুরোপুরি ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে জটিলভাবে গ্রামারের নিয়মকানুন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে আনন্দের তো কিছুই দেখছি না।

বইয়ের পক্ষে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ‘প্যারাগ্রাফ’ আর ‘রচনা’ মুখস্থ করতে হবে না। গাইডবই ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। বিভিন্ন সিচুয়েশনে শিক্ষার্থীরা ডেমোক্রেটিক ওয়েতে নাকি সমস্যা ডিল করতে করতে এগিয়ে যাবে। ইংরেজির স্কিলগুলো ধারালো করা না হলে কীভাবে তারা লিখবে আর কীভাবে ডেমোক্রেটিক ওয়েতে এগোবে। এগোবে যেমন তাদের ইংরেজির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে পুরোটাই বাংলায় এবং এ কথাগুলোই বেশি বেশি আলোচিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপ করতে গিয়ে শিক্ষকদের যে, ডেভেলপ করতে হবে তার তেমন কোনো আলোচনা বা প্রশিক্ষণ অনুপস্থিত। আরও বলা হয়েছে, ইংরেজিতে ফেলের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যাবে। ইংরেজিতে এখন কত শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করে?

কৃষিবিজ্ঞান, ইতিহাস কিংবা ইসলামিয়াতে ফেল করতে পারে, কিন্তু ইংরেজিতে তো ফেল করা কঠিন। বোর্ড পরীক্ষার ফল তো তাই বলে। এখন ৬০ শতাংশ নম্বর শিক্ষকের হাতে, অতএব ফেলের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ইংরেজি না শিখে পাস, এখন না শিখে না পড়ে, পাস হবে।  এটিকেও আনন্দের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না জানি না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, একজন দক্ষ শিক্ষক কিন্তু পত্রিকার কিংবা বইয়ের একটি পাতা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের হাসাতে পারেন, নাচাতে পারেন, গান গাওয়াতে পারেন, গ্রামার শেখাতে পারেন, ভাষার চারটি স্কিল প্র্যাকটিস করাতে পারেন, সঙ্গে সঙ্গে শেখাতে পারেন মানবিকতা, সহানুভূতি, দেশপ্রেম। অর্থাৎ জাদু কিন্তু শিক্ষকের হাতে। শিক্ষকদের সেভাবে প্রস্তুত করতে পারলে এত ঢাকঢোল পেটানো দরকার হয় না। শিক্ষকরা নিজেরাই আনন্দের মাধ্যমে পড়াতে পারবেন, বিষয় শেখাতে পারবেন। কিন্তু শিক্ষকদের সেই উন্নয়নের ব্যবস্থাটি কোথায়? এটি নিয়ে ভেবে দেখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত