ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে নবীন ছাত্রীকে নির্যাতনের পর বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণের ঘটনার পেরিয়েছে ১৩ দিন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হওয়ায় সেদিনের ঘটনার তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন এবং হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। তদন্তের অংশ হিসেবে এসব কমিটির সদস্যরা হলের ছাত্রীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছে। কিন্তু সাধারণ ছাত্রীরা তদন্ত কমিটির কাছে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছে। আতঙ্ক বিরাজ করছে তাদের মাঝে। বিশেষ করে গণরুমে অবস্থানরত ছাত্রীরা বেশি আতঙ্কে আছেন বলে জানা গেছে। কেননা ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজন এখনো হলে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। তদন্ত কমিটির সদস্য ও সাক্ষ্য দিতে ডাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা গত বৃহস্পতিবার নির্যাতনের শিকার ছাত্রী ও অভিযুক্ত ছাড়াও গণরুমের অন্য ছাত্রীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সর্বোচ্চ গোপনীয়তা অবলম্বন করে সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও আতঙ্কে অনেকেই তদন্ত কমিটিকে সব তথ্য দিচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণরুমের কয়েকজন ছাত্রী বলেন, এখনো হলে থাকা অভিযুক্তরা এবং তাদের সহযোগীরা বিভিন্নভাবে গণরুমের ছাত্রীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তদন্ত কমিটির কাছে কথা না বলতেও চাপ দেওয়া হচ্ছে। ওই দিনের ঘটনার যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বা পাশের কয়েকটি কক্ষে ছিলেন, সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন তারা।
তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। তদন্ত কমিটি ডেকে কথা বলছে, কিন্তু ভয়ে সবকিছু বলতে পারিনি। পরে আবার কোনোভাবে যদি আমার নাম সামনে চলে আসে। ওইদিন ওই কক্ষে কী কী ঘটেছে সবাই খুব ভালোভাবেই জানে। কিন্তু আমি শুধু চড়-থাপ্পড়ের শব্দ শোনার বিষয়টি ছাড়া ভয়ে আর কিছু বলার সাহস পাইনি। অন্যরা বলেছে কি না আমার জানা নেই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ছাত্রী বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কী হবে জানি না। আমাদের যেহেতু অনেক দিন হলে থাকতে হবে তাই ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। এ ছাড়া অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রীর সহযোগীদের সবসময় নজরদারিতে থাকতে হচ্ছে সবার। সকাল-সন্ধ্যায় একাধিকবার তারা গণরুমে এসে ঘুরে যায়।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। আমরা গোপনীয়তা রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ কবে নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি বলা যাবে না। আমরা প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য পাচ্ছি। সবকিছু পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
একই প্রশ্নের জবাবে দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। হলের তদন্ত কমিটির কাজ শেষের দিকে।’
অভিযুক্ত ছাত্রীদের হলে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট যেহেতু শুধু দুজনকে বাইরে রাখতে বলেছেন, এ জন্য অন্যদের হলে থাকতে নিষেধ করা যায় না। তবে হলে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আছে। কেউ যদি নাম প্রকাশ না করেও অভিযোগ করে আমরা বিষয়টি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেব। এ ছাড়া আমাকেও কোনো ছাত্রী অভিযোগ জানালে তার নাম গোপন রেখে ব্যবস্থা নেব।’
এর আগে গত ১১ ফেব্রুয়ারি দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতন করা হয় ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী ফুলপরীকে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরী অন্তরা এবং তার সহযোগী তাবাসসুম ইসলাম, মোয়াবিয়া জাহান, হালিমা খাতুন ঊর্মি ও ইশরাত জাহান মীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা ফুলপরীকে মারধরের পর বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে রাখেন। এ ঘটনার পর সকালে ভয় পেয়ে হল ছেড়ে বাসায় চলে যান ফুলপরী। র্যাগিংয়ের নামে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার বিচার ও নিরাপত্তা চেয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রক্টর ও ছাত্র-উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ইবি শাখা ছাত্রলীগ আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ছাড়াও তদন্ত করছে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি।
