চিহ্নিতদের ছাড়াই সন্ত্রাসী তালিকা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৩, ০৪:০৮ এএম

আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠ মাঝেমধ্যেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। হামলা-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। নির্বাচন ঘিরে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা সক্রিয় উঠতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট মহল। কিন্তু চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরির ব্যাপারে এখনো অনেকটা গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি)।

এ ছাড়া ২০২১ সালের মার্চে সিএমপির সন্ত্রাসী তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি। ৩২৩ জনের ওই তালিকায় চিহ্নিত অনেকের নাম নেই। আবার এই তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। যে কারণে তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আ স ম মাহতাব উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধীর তালিকা তো প্রতিদিন হয়। অপরাধের ধরন অনুয়ায়ী অপরাধীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিডিএমএস) ঢুকে যায়। রাজনৈতিক বিবেচনায় সন্ত্রাসী তালিকা হয় না।’

এদিকে আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হচ্ছে, মাঠপর্যায় থেকে এমন তথ্য পেয়ে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করে চট্টগ্রামে কর্মরত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে আছে। তাদের নির্দেশে দেশে অবস্থানকারী সহযোগীরা খুন, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। এমনকি হত্যাকা-ের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা।

সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুব আলম। গত বুধবার তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে আমরা সন্ত্রাসীদের তালিকা করছি। আগামী দুই মাসের মধ্যে ওই তালিকা তৈরির কাজ শেষ হবে।’

২০২১ সালে পুলিশের করা তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, কোতোয়ালি থানায় ৪৪, বাকলিয়ায় ২৪, চকবাজারে ১৪, পাঁচলাইশে ২১, চান্দগাঁওয়ে ২, খুলশীতে ১২, বায়েজিদ বোস্তামীতে ৮৫, ডবলমুরিংয়ে ১৮, হালিশহরে ৩৪, পাহাড়তলীতে ১২, আকবর শাহে ৭, ইপিজেডে ২৫, বন্দরে ৩, পতেঙ্গায় ১১ ও কর্ণফুলী থানায় ১১ জন আছে। তাদের মধ্যে বর্তমানে কতজন কারাগারে আছে, সে তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তালিকাভুক্তদের ৯৫ শতাংশ জামিনে আছে।

এই তালিকায় ৯৪ জনের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪৩ ও বিএনপির ৩৮ এবং জামায়াতের ১৩ জন রয়েছে।

বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের যারা তালিকাভুক্ত তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একটি থেকে সর্বোচ্চ ২৮টি পর্যন্ত মামলা আছে। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের যারা তালিকাভুক্ত তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১৮-২০টি মামলা আছে। তবে সন্ত্রাসী তালিকাটি রাজনৈতিক, পেশাদার এ রকম কোনো ভাগ করে করা হয়নি।

এই তালিকায় নগরের বিভিন্ন থানায় খুন, অস্ত্র, চাঁদাবাজির মামলা আছে এমন ১১ জনের নাম তালিকায় আসেনি। তারা আওয়ামী লীগ-যুবলীগের রাজনীতিতে জড়িত। তাদের মধ্যে চারজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

নগর পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অপরাধী শনাক্তের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হলো সন্ত্রাসী তালিকা হালনাগাদ করা। আর তালিকা তৈরির সময় কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীদের ছাড় দেওয়া হয় না।

কিন্তু ২০২১ সালের তালিকায় কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তালিকাভুক্ত ওই চারজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের ৪৮ পৃষ্ঠপোষক বা নেতার তালিকা করে। ওই তালিকায় চার ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ সাত ‘গডফাদারের’ নাম উঠে আসে। তাদের মধ্যে আছেন চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোস্তফা ওরফে টিনু, ১৩ নম্বর পাহাড়তলীর ওয়ার্ডের ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী, চান্দগাঁও ওয়ার্ডের এসরারুল হক। এ ছাড়া আছেন লালখানবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম। তিনি নগর ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যা মামলার আসামি।

কাউন্সিলর টিনুকে ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব-৭। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার পাঁচটি মামলা রয়েছে। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। টিনু মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক বা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রত্যাশী।

মহানগর যুবলীগের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রত্যাশী খোকন চন্দ্র তাঁতী ওরফে কে সি তাঁতী ২০১৩ সাল পর্যন্ত মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন। হালিশহর থানা এলাকায় ১৯৯২ সালের জোড়া খুন, ২০১৩ সালের ২৪ জুন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর তথা সিআরবি এলাকায় জোড়া খুন এবং সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জি এস আমিনুল ইসলাম স্বপন হত্যা মামলার আসামি তিনি।

কাউন্সিলর এসরারুল হকের বিরুদ্ধে বহদ্দারহাট এলাকায় জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে এক ডজন মামলা আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল চান্দগাঁও থানার ফরিদের পাড়া এলাকায় চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ড্রিল মেশিন দিয়ে আমজাদ হোসেন নামের এক যুবকের পা জখম করার অভিযোগ আছে। ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও এমইএস কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি মো. ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা ছিল ৬টি। তার বিরুদ্ধেও কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তাররের জেরে ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট জাকির হোসেন নামের দশম শ্রেণিপড়ুয়া তার এক অনুসারী প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। বিগত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হলফনামায় তিনি ‘মামলার বর্তমান অবস্থা’ কলামে ‘প্রত্যাহার’ ও ‘খালাস’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে সিটি কলেজের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক সিনাউল হক আশিক হত্যা মামলা ছিল। পরে রাজনৈতিক বিবেচনায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পাঠানটুলি এলাকার সাবেক কাউন্সিলর আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের বিরুদ্ধে সাক্ষীর অভাবে ২৮টি মামলায়ই খালাস ও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়। এখন তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে।

২০১৩ সালে সিআরবি এলাকায় জোড়া খুন মামলার আরেক আসামি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল আলম লিমন। তিনি মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হতে চান। অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার বিরুদ্ধে লেগে আছে। সিআরবির মামলাটি পুরোটাই ষড়যন্ত্রমূলক। মামলাটি বিচারাধীন। আশা করি, বেকসুর খালাস পাব।’

বায়েজিদ থানা এলাকায় হত্যা ও চাঁদাবাজি মামলার আসামি আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দীন। তিনিও পেতে চান নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ। তার বিরুদ্ধে খুনের মামলা ছাড়াও দখলবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে।

তালিকা সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকার বিষয়ে সিএমপির উপকমিশনার (অপরাধ) নিষ্কৃতি চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের তালিকা করে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। ২০২১ সালে করা তালিকাটি আমি দেখিনি। তবে সন্ত্রাসীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকা উচিত নয়।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় হতে পারে না। তালিকায় অপরাধীদের দলীয় পরিচয় থাকা উচিত নয়।’

সচেতন নাগরিক কমিটি, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘সন্ত্রাসী কারা তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানে। সন্ত্রাসীদের কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না। তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে নির্ভরতা, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। তা যদি না হয় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে আস্থার সংকট বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত