ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় মাইক্রোবাস উল্টে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন লেগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। রবিবার রাত ২টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালের রাঙামাটিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন, ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার খামারবাসা গ্রামের আক্কাস আলীর স্ত্রী দোলেনা খাতুন (৪০) ও তোতা মিয়ার স্ত্রী রেজিয়া খাতুন (৫০), ঝরিনা খাতুন (৪০), আশিক (৭)। তারা একে অপরের আত্মীয়-স্বজন।
দগ্ধরা হলেন, আক্কাস আলী (৫৫), তোতা মিয়া (৬০), তোতা মিয়ার নাতি ইয়াসিন (৫), একই ইউনিয়নের পূর্ব সালকোডা গ্রামের সফিকুল ইসলামের ছেলে রুবেল মিয়া (৩২) ও তার স্ত্রী ফেরদৌসি আক্তার (২৬)। এদের মধ্যে আক্কাস মিয়াকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
ত্রিশাল ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সাব-অফিসার আবুল কালাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ত্রিশাল উপজেলার রাঙামাটি নামক স্থানে রবিবার রাত ২টার দিকে যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে পড়ে তাৎক্ষণিক আগুন ধরে যায়। এতে মাইক্রোবাসের চার যাত্রী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধে আহতদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় ত্রিশাল ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ছাড়াও দুই নারীসহ পুড়ে যাওয়া চারজনের মরদেহ গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাত নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন তোতা মিয়া জানান, রবিবার রাত ১০টায় মেয়ের বাসা ঢাকায় যাওয়ার জন্য আমার স্ত্রী রেজিয়া, ছোট বোন দুলেনা বেগম ও নাতি ইয়াসিনকে সঙ্গে নিয়ে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার মুন্সিরহাট থেকে মাইক্রোবাসে করে রওনা হই। ত্রিশাল পার হওয়ার পর রাত ২টার দিকে একটি যাত্রীবাহী বাস মাইক্রোবাসটিকে ওভারটেক করতে যায়। এ সময় মাইক্রোবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এরপর সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে আগুন লেগে যায়। আমরা জানালা দিয়ে কোনো রকমে বের হই। কিন্তু আমার স্ত্রী, ছোট বোন দুলেনাসহ চারজন গাড়ি থেকে বের হতে পারেনি। তারা চারজন গাড়ির ভেতরে পুড়ে মারা যায়।
ত্রিশাল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন জানান, ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মাইক্রোবাস চালক পলাতক রয়েছে। এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মায়ের হাতের পিঠা খেতে পারলাম না : মায়ের হাতের পিঠা খাওয়া হলো না, শেষবারের মতো কথাও বলতে পারলাম না। কথাগুলো বলছিল ময়মনসিংহের ত্রিশালে মাইক্রোবাস উল্টে আগুন লেগে নিহত রেজিয়া খাতুনের মেয়ে শিখা আক্তার। গতকাল সোমবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি ওয়ার্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত চিকিৎসাধীন বাবা তোতা মিয়ার পাশে বসে বিলাপ করছিল শিখা আক্তার।
তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলছিল, আমি ও আমার স্বামী গার্মেন্টসে কাজ করি। ঢাকার শাহাদাতপুরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। আমার ছেলে ইয়াসিন আমার মা-বাবার সঙ্গে থাকত। দিনের বেলায় যানজটের ভোগান্তি কমাতে রবিবার রাতে আমার ঢাকার বাসায় আসার জন্য ইয়াসিনকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মা ও ফুফুসহ আরও বেশ কয়েকজন মিলে একটি মাইক্রোবাসে রাত ১০টার দিকে ধৌবাউড়া থেকে রওনা দেন। পরে রাতে খবর পাই মাইক্রোবাসটি খাদে পড়ে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে মা-ফুফুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ সময় আমার ছেলে, বাবাসহ অন্যরা আহত হয়েছে।
কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার মা আমার জন্য পিঠা বানিয়ে নিয়ে আসছিল, কিন্তু আমার মায়ের হাতের পিঠা খেতে পারলাম না, শেষ বারের মতো মায়ের সঙ্গে কথাও বলতে পারলাম না। আমার মা গ্রামের বাড়ি থেকে আসার সময় আমার জন্য গরুর দুধ, পিঠা, শাক-সবজি নিয়ে আসত। এখন আর কেউ আমার জন্য এসব নিয়ে আসবে না। আমি এতিম হয়ে গেলাম।
উল্লেখ্য, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ত্রিশাল উপজেলার রাঙামাটি নাম স্থানে রবিবার রাত ২টার দিকে যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে পড়ে তাৎক্ষণিক আগুন ধরে যায়। এতে মাইক্রোবাসের চার যাত্রী আগুনে পুড়ে মারা যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার নেওয়ার পথে অপর একজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আরও চারজন আহত হয়।
