প্রতিষ্ঠার ১৯ বছরে একের পর এক সক্ষমতার জানান দিয়ে যাচ্ছে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি দমন ও সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে পুলিশের ইউনিটের সাফল্য ঈর্ষণীয়। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। সম্প্রতি পাহাড়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামের নতুন জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে একের পর অভিযান চালিয়েছে। যদিও র্যাবের কিছু অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, সেনা, বিমান, নৌবাহিনী, পুলিশ, আনসার ভিডিপির চৌকস সদস্যদের নিয়ে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে গঠিত হয় র্যাব। দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে গঠিত এ বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবসে গঠিত হলেও ওই বছরের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। বর্তমানে এ বাহিনীটির সারা দেশে ১৫টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে এবং সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরায়। অপরাধ দমনে সংস্থাটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ইতিমধ্যেই সংস্থাটির সিনিয়র কর্মকর্তাসহ ১৩ জন সদস্য জীবন দিয়েছেন।
সার্বিক বিষয় নিয়ে র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এম খুরশীদ হোসেন বলেন, র্যাবের অব্যাহত অভিযানের ফলে দেশে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল না হলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যে কারণে জঙ্গিবাদ দমনে র্যাব রোল মডেল। আমরা অনেক জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষস্থানীয়দের বিরুদ্ধে সফল অভিযান করেছি এবং তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, সমতলে গড়ে ওঠা নতুন জঙ্গি সংগঠন পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এসব জঙ্গি সংগঠনের খোঁজে পাহাড়ে ধারাবাহিক অভিযান শুরু করে র্যাব। শিগগিরই স্মার্ট বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে র্যাব।
র্যাব জানায়, সন্ত্রাস, মাদক চোরাচালান, রমনায় বোমা হামলা, ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির উত্থানের বাংলাদেশ এখন অনেকটাই শান্ত। ২০১৬ সালে ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর আর কোনো বড় ধরনের জঙ্গি হামলা দেখেনি বাংলাদেশ। র্যাবের চৌকস গোয়েন্দা বিভাগ জেএমবিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় জঙ্গি সংগঠনের আস্তানা, এদের মূল হোতা, অর্থদাতা ও শক্তির জোগানদাতাদের খুঁজে বের করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তাদের আস্তানা। র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে জেএমবি ও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের প্রায় তিন হাজার সদস্য।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জেএমবিপ্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান সানি প্রমুখ। এ ছাড়াও একটা সময় সুন্দরবনের স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা অতিষ্ঠ ছিল জলদস্যু ও বনদস্যুর অত্যাচারে। সুযোগ পেলেই তারা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জেলে বাওয়ালিদের অপহরণ করে মুক্তিপণের নামে হাতিয়ে নিত কোটি কোটি টাকা। চালাত অমানুষিক নির্যাতন। কেউ কেউ নিজেদের ভিটেমাটি বিক্রি করে দস্যুদের চাহিদা পূরণ করে ফিরে আসত। আবার অনেকের সেই সুযোগ না থাকায় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একসময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ত তাদের নিথর দেহ। এরপর দস্যু দমনে একের পর এক সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে র্যাব। অভিযানে টিকতে না পেরে সুন্দরবনের ৩২টি ছোট-বড় দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সক্রিয় সদস্য র্যাবের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে আত্মসমর্পণ করে। এ ছাড়াও সুন্দরবন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার আত্মসমর্পণ করা ৪০৫ জলদস্যুকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে র্যাব। এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন।
র্যাব সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬ জন বিভিন্ন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র-গোলাবারুদ, বিস্ফোরক দ্রব্যাদি সংক্রান্ত মামলায় ১৪ হাজার ২৫২, জঙ্গিসংক্রান্ত মামলায় ২ হাজার ৯২৯, মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলায় ৩৬ হাজার ১৪৮, প্রশ্নপত্র ফাঁসসংক্রান্ত ৪৫৪, সাইবার ক্রাইম সম্পর্কিত ৭৯১, জলদস্যু গ্রেপ্তার ৬৭৫, বনদস্যু ১৬০, মানব পাচারসংক্রান্ত ১ হাজার ৬০৫, অপহরণসংক্রান্ত গ্রেপ্তার ৪ হাজার ৫৩৯, নারী ও শিশু পাচার সংক্রান্ত ৩১৭, যৌন হয়রানিসংক্রান্ত ৩৮১, ভুয়া র্যাব সদস্য গ্রেপ্তার ৫৯৫, ভুয়া অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য গ্রেপ্তার ৪৯৮, স্বর্ণালংকার ডাকাতিসংক্রান্ত ২৭৪, ডাকাতিসংক্রান্ত ২ হাজার ৬৩৯, চাঞ্চল্যকর হত্যা/ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেপ্তার ৩ হাজার ৮৭৩, ছিনতাইকারী/মলম/অজ্ঞান পার্টি গ্রেপ্তার ৯ হাজার ৮১৮, চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার ২ হাজার ৩০, ভুয়া ডাক্তার গ্রেপ্তার ৪৩৭, অবৈধ ভিওআইপি গ্রেপ্তার ১ হাজার ২৯, বিভিন্ন প্রতারণার দায়ে ৭ হাজার ৫২, প্রতœসম্পদ উদ্ধার ও জড়িত গ্রেপ্তার ৫২৬, দেশি-বিদেশি জাল নোট ব্যবসায়ী এবং হুন্ডি চক্রের ২ হাজার ১৫৪, চরমপন্থিসংক্রান্ত গ্রেপ্তার ৫০৫, গাড়ি চুরিসংক্রান্ত ১ হাজার ৪৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দপ্তর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব এবং এর সাতজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফরে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। এ সময় তিনি কথা বলেন র্যাবের নিষেধাজ্ঞা নিয়েও। তিনি র্যাবের কর্মকা-ে প্রশংসা করেন। গত সপ্তাহের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অসামান্য উন্নতি হয়েছে। এটা খুবই ভালো কাজ। গত ১৯ মার্চ কুর্মিটোলায় র্যাব সদর দপ্তরে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা র্যাবের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আমরা জানি কিছুদিন আগে একটি দেশ র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল বলে অনেকেই প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম এখানে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
