মহাসড়কে ৮৮৩ বাঁক যাত্রীদের মরণফাঁদ

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ০২:৩৯ এএম

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নানান চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছে না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নাখোশ। আবার পুলিশের কর্মকা- নিয়ে পরিবহন নেতারাও খুশি হতে পারছেন না। কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য প্রতি মাসে ‘মাসোহারা’ নিয়ে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের সুবিধা করে দিচ্ছেন এমন অভিযোগ ওঠায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চটেছেন দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের ওপর। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে গতকাল বুধবারও একটি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সড়কে বাঁকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

পুলিশের বৈঠক সূত্র জানায়, সারা দেশের মহাসড়কগুলোতে ৮৮৩ বাঁকে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব বাঁক দ্রুত সোজা করার সুপারিশ করা হয়েছে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে। গত ১০ বছরে মহাসড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে এসব বিপজ্জনক বাঁক চিহ্নিত করা হয় বলে বৈঠকে জানানো হয়। পাশাপাশি চাঁদাবাজ পুলিশ সদস্যদের ধরতে ছদ্মবেশে তৎপর থাকতে বিশেষ বার্তা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশ সূত্র জানায়, ৮৮৩টি বাঁকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬৪টি বাঁক রয়েছে দক্ষিণ বিভাগের মাদারীপুর হাইওয়ে অঞ্চলে।

এ অঞ্চলের আওতায় আছে মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, বরিশাল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, মাগুরা, যশোর ও নড়াইল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে বগুড়া অঞ্চলে। এ অঞ্চলের বগুড়া, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার মহাসড়কে বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে ২৪৮টি। এর বাইরে কুমিল্লায় ১৮১, সিলেটে ১২৬ ও গাজীপুর অঞ্চলে ৬৪টি বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে।

জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি শাহাবুদ্দীন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে দুর্ঘটনা তদন্ত করে এসব বাঁক বা মোড় চিহ্নিত করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ করে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তারা এসব বাঁকগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। পাশাপাশি চালক ও পথচারীদের সচেতন করতেও পুলিশের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই মহাসড়কের বিপজ্জনক বাঁকগুলোর দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সচেতনতার পাশাপাশি মহাসড়ককে বাঁকমুক্ত করতেও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া মহাসড়কে থ্রি-হুইলার যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন যেন মহাসড়কে চলতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নসিমন, করিমন ও ভটভটির মতো যানবাহন মহাসড়কে উঠলেই তা ডাম্পিংয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মহাসড়কের এসব বাঁক বছরের পর বছর আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে কিছু বাঁক সোজা করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ বাঁক এখনো সোজা না করার কারণে দুর্ঘটনার হার বাড়ছে। পাশাপাশি অনেক যানবাহনের ফিটনেস না থাকার পরও তারা মহাসড়কে বেপরোয়া। বেশিরভাগ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই তদন্তে ফিটনেস ফেইলের তথ্য বেরিয়ে আসে। এসব বিষয়ে সরকারকে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বরিশাল থেকে গৌরনদী পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার মহাসড়ক পাড়ি দিতে একজন চালককে অতিক্রম করতে হয় চারটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এসব বাঁকে বিপরীত দিকের যানবাহনের অবস্থান চিহ্নিত করা যায় না। চালক যতক্ষণে বুঝতে পারেন, তার মধ্যেই ঘটে যায় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বরিশাল-ভুরঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে অন্তত দুই ডজন। কাশিপুরের বন বিভাগ ও সমবায় ইনস্টিটিউটের সামনের রাস্তা, গড়িয়ারপাড়ের জননী পেট্রলপাম্প ও কলাডেমা, ক্যাডেট কলেজ, রহমতপুর সেতুর ঢাল, বিমানবন্দর মোড়, দোয়ারিকা সেতুর ঢাল, জয়েশ্রী, গৌরনদী প্রবেশপথ, বামরাইল স্কুলসংলগ্ন, বাটাজোর, আশুকাঠি, টরকি বাজার, কটকস্থল, বার্থি, ভুরঘাটা সেতুর আগে বিপজ্জনক সব বাঁক রয়েছে। বিপজ্জনক বাঁকগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে অবৈধ যানবাহন।

সাকুরা পরিবহনের চালক জমির উদ্দিন মোল্লা বলেন, এ মহাসড়কের বিপজ্জনক বেশ কয়েকটি বাঁক রয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের বাঁক, জয়েশ্রী, আশুকাঠি, টরকি বাজার, বার্থি তারা শংকর মন্দির, ভুরঘাটাসহ এ রুটেই ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকের আগে দিকনির্দেশনা সংবলিত সাইনবোর্ড থাকলেও গতির কারণে তা খেয়াল করা যায় না। বাঁকগুলোতে দুটি পরিবহন মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত কেউ কাউকে দেখতে পারে না। নতুন চালকরা অনেক সময় এসব বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন।

যশোর রুটে চলাচলরত ট্রাকচালক মমিনউদ্দিন বলেন, দেশের অন্য যেকোনো মহাসড়কের তুলনায় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মহাসড়কগুলো দুর্ঘটনাপ্রবণ। এ মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। রাতে চলাচলের সময় এসব বাঁকে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন দেখা যায় না। ঢাকা-ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটটটির মতো অবৈধ গাড়ির চলাচল বেশি। এসব যানবাহনের জন্যও মহাসড়কটি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

সিলেট বিভাগের সঙ্গে সড়কপথে সারা দেশের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩৪ কিলোমিটার অংশ পড়েছে আশুগঞ্জ, সরাইল ও বিজয়নগর উপজেলায়। এসব স্থানে বাঁক রয়েছে ১০টি। আশুগঞ্জ গোলচত্বর, শাহবাজপুর তিতাস সেতুসংলগ্ন বাঁক, ভৈশামোড়া, রামপুরা, চান্দুরা, বীরপাশা ও ক্ষেতবাড়ি এলাকার বাঁকগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি শামসুল আলম বলেন, মহাসড়কে বিপজ্জনক বাঁকগুলোতে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব বাঁকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে। বাঁকগুলো সম্পর্কে আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যানচালকদের নিয়ে সভা করা হয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাঁকগুলোর দুর্ঘটনা অনেকটাই কমিয়ে আনা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত