শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্তে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২১ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে ২২৭ জন। সে হিসাবে দেশে যক্ষ্মা শনাক্তের হার ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ বা ৩৭ হাজার ৫০০ শিশু যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৪ শতাংশ বা দেড় হাজারের বেশি নয়। অর্থাৎ এখনো ৬ শতাংশ বা ২২ হাজার ৫০০ শিশু যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের বাইরে রয়েছে। এর অর্থ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও শনাক্ত না হওয়ায় এসব শিশু চিকিৎসা পাচ্ছে না।
অবশ্য দেশে শিশু রোগীর সংখ্যার সঠিক কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। গত এক বছরে কত শিশু যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, সে তথ্যও নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশে শিশু যক্ষ্মার এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
শিশু যক্ষ্মা রোগী শনাক্তে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে বলে স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মাহফুজার রহমান সরকার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা মোট যক্ষ্মা রোগীর ৮ শতাংশ বা তার বেশি যেন শিশুদের যক্ষ্মা নির্ণয় করতে পারি। কিন্তু বাচ্চাদের শনাক্ত কম হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আছি।
এ কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশে ৪ শতাংশ বা তার কিছু বেশি শিশু যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করতে পারছি। মোট যে শনাক্তের হার, তার ৮ শতাংশ (বেসরকারি হিসেবে ১০ শতাংশ) শিশু হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে ৪ শতাংশের মতো। বাকি ৪ শতাংশ শনাক্ত হচ্ছে না।
শনাক্ত কম হওয়ার কারণ হিসেবে এই কর্মকর্তা বলেন, শিশুরা বলতে পারে না বা উপসর্গ বোঝে না, আবার অভিভাবকরাও সচেতন না। ফলে বেশিরভাগ শিশু শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অথচ সার্বিক ক্ষেত্রে আমাদের যক্ষ্মা শনাক্ত হার অনেক বেশি। অনেক দেশের চেয়ে ভালো আছি। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী আমাদের মোট শনাক্তের হার ৮২ শতাংশ।
অবশ্য শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্তের হার বাড়ানোর জন্য নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান সরকারের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, শিশুদেরও যে যক্ষ্মা হতে পারে, সে তথ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচার করা হচ্ছে। আগে শিশুদের যক্ষ্মা শনাক্তের হার আরও কম ছিল। কিন্তু এখন আমরা যেভাবে কাজ করছি তাতে সামনের দুই-এক বছরের মধ্যে শনাক্তের হার আরও বাড়বে।
এমন অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। ১৮৮২ সালে ২৪ মার্চ ডা. রবার্ট কক যক্ষ্মা রোগের জীবাণু আবিষ্কার করেন। এর ১০০ বছর পর ১৯৮২ সাল থেকে এই দিনে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয়Ñ ‘হ্যাঁ! আমরা যক্ষ্মা নির্মূল করতে পারি’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।
১ বছরে ১ লাখ রোগী কমেছে : জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি দেশে যক্ষ্মা রোগীর সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেছে। কর্মসূচির হিসেবে, গত বছর বাংলাদেশে নতুন ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৩১ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে । এ সময় যক্ষ্মার উপসর্গ আছে এমন ২৯ লাখের বেশি লোকের নমুনা পরীক্ষা করে এ রোগী শনাক্ত হয়েছে। সে হিসাবে শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশ।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির হিসেবে, এর আগের বছর ২০২১ সালে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার। সে হিসাবে গত এক বছরে দেশে যক্ষ্মা রোগী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৬৯ জন। চিকিৎসা নিরাময়ের হার গত ১০ বছর ধরে ৯৫ শতাংশের বেশি আছে। সর্বশেষ গত বছর তা আরও বেড়ে ৯৭ শতাংশ হয়েছে।
গত বছর সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে, ৭৪ হাজার ৯৪৫ জন ও সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে, ১৬ হাজার ৪৯১ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৪৮ হাজার ৯৩৮, রাজশাহীতে ২৭ হাজার ৫৪৫, খুলনায় ২৭ হাজার ১১৭, রংপুরে ২৬ হাজার ৮২৮, সিলেটে ২২ হাজার ২০৭ ও ময়মনসিংহে ১৮ হাজার ৩৬০ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এখনো শনাক্তের বাইরে ২০% রোগী : এখন পর্যন্ত দেশে মোট রোগীর ৮০ শতাংশকে শনাক্ত করতে পারছে সরকার ও বাকি ২০ শতাংশ শনাক্তের বাইরে রয়েছে। ফলে এই ২০ শতাংশ রোগী কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না। এমনকি তাদের মধ্যে ঠিক কী পরিমাণ রোগী মারা যাচ্ছে, সে তথ্যও পাচ্ছে না সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে যক্ষ্মা নির্মূলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে সার্বিক শনাক্ত শতভাগ পূরণ করতে হবে। সব রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে না পারলে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সালে মোট শনাক্ত যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে যক্ষ্মা রোগী ২২৭ জন। সে হিসাবে মোট রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ জন। কিন্তু সে বছর শনাক্ত হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার। সে হিসাবে এখনো শনাক্তের বাইরে ৯৩ হাজার ৭৫০ জন। অর্থাৎ এই ২০ শতাংশ রোগী এখনো সরকারের শনাক্ত ও চিকিৎসার নেটওয়ার্কের মধ্যে আসেনি।
প্রতি ১২ মিনিটে যক্ষ্মায় মরছে ১ জন : গত ১০ বছরে দেশে যক্ষ্মায় মৃত্যু কমলেও এখনো এ সংখ্যা উদ্বেগজনক। গত ২০২১ সালে যক্ষ্মায় মারা গেছেন ৪২ হাজার মানুষ। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির হিসেবে, চিকিৎসার মাধ্যমে ২০১২ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রায় ২৩ লাখ যক্ষ্মা রোগীকে বাঁচানো গেছে। ২০১৫ সালে যেখানে প্রতি ১ লাখে ৪৫ জন লোকের মৃত্যু হতো, সেখানে ২০২১ সালে যক্ষ্মায় মৃত্যু প্রতি লাখে ২৫ জনে নেমে এসেছে। কিন্তু এখনো দেশে প্রতি মিনিটে একজন ব্যক্তি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতি ১২ মিনিটে যক্ষ্মার কারণে একজন মারা যাচ্ছে।
যক্ষ্মা নির্ণয় ও চিকিৎসা বিনামূল্যে : যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মাহফুজার রহমান সরকার বলেন, দেশে সরকারিভাবে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এ ব্যয় সরকার বহন করে। মানুষ এ সুবিধা নিচ্ছে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ এ তথ্য জানে না। সে জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। যক্ষ্মা পরীক্ষার ব্যবস্থা জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও আছে।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানান, যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে বাংলাদেশে ৫১৮টি জিনএক্সপার্ট মেশিন, ১ হাজার ১১৯টি মাইক্রোস্কোপ, ২০৫টি ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন ও ৩৮টি ট্রুনেট মেশিন রয়েছে। এসব পদ্ধতিতে যক্ষ্মার প্রায় ৮২ শতাংশ রোগী শনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়াও একটি ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ও পাঁচটি রিজিওনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরির মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, সরকারি চারটি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, সাতটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং সরকারি সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও এনজিও ক্লিনিকে বিনামূল্যে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা দিচ্ছে সরকার।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফজালুর রহমান জানান, যক্ষ্মা শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিটি রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি নিয়মিত ওষধু সেবন করার জন্য প্রতিটি রোগীর সঙ্গে একজন ডটস প্রোভাইডার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে রোগী শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে যক্ষ্মায় মৃত্যুহার কমে এসেছে এবং চিকিৎসার সাফল্যের হার বেড়েছে। এ উদ্যোগ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। এ সাফল্যের কারণে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার (এমডিআর টিবি) হারও কমে এসেছে।
কেন শিশুরা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছে : এ ব্যাপারে রাজধানীর শ্যামলী ২৫০ শয্যার টিবি ও অ্যাজমা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, যক্ষ্মা বায়ুবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক ব্যাধি। রোগটা সাধারণত মাইক্রোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে। এই জীবাণু যেকোনো অঙ্গেই সংক্রমিত হতে পারে। তবে যক্ষ্মায় আক্রান্ত শিশুরা তাদের লক্ষণগুলো বুঝিয়ে বলতে পারে না, তাই প্রায়ই তাদের ক্ষেত্রে এ রোগটি নির্ণয় করতে দেরি হয় এবং উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। বিশ্বব্যাপী মোট যক্ষ্মা রোগীর ১২ শতাংশ শিশু। কিন্তু বাংলাদেশে সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়ার কারণে এ হার চার শতাংশের মতো। শিশুদের হার আরও বেশি হবে বলে মনে করা হয়।
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, শিশুর শরীরে যক্ষ্মার জীবাণু প্রবেশ করে বড়দের কাছ থেকে। ফুসফুসে আক্রান্ত একজন যক্ষ্মা রোগীর সংস্পর্শে এলে শিশুর যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তবে বড় শিশুদের তুলনায় এক মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এরকম শিশুরা তাদের সময়ের একটা বড় অংশ পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় ও খেলার সাথীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটায়। এ ছাড়া এমন বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বড় শিশুদের তুলনায় কম থাকে। অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুদের যক্ষ্মার ঝুঁকি বেশি। কারণ অপুষ্টি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
