‘হামার তিস্তাপারের মানুষগুলার বারো মাসেই কষ্ট’

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৩, ০১:১২ এএম

‘আগোত হামরা ২৫-৩০ ফিট মাটির নিচোত থাকি বোডিং দিয়া পানি তুলি আবাদ করছি। আবাদ করা সহজ আছিল। এলা ৫০ ফিট বোডিং করলেও পানি পাওয়া যায় না। নদীত পানি না থাকার জন্য এই অবস্থা। চরোত হামারগুলার আবাদ করা খুব সমস্যা হইছে। আবাদে খরচও মেলা।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তা নদীর অববাহিকার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খেতাব খাঁ গ্রামের কৃষক মন্ডল আলী (৬৫)।

তিস্তার ওপারে মন্ডল আলীর জমি। কিন্তু নদীতে হাঁটুপানি। নৌকাও চলে না। অন্য কোনো গাড়িরও সুযোগ নেই। তারপরও কষ্ট করে যে আবাদ করেন, তা বাড়িতে আনা যে কী কষ্টের তা বলার ভাষা নেই। আবার যখন বন্যা আসে, ভারত পানি ছেড়ে দেয়, সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বাড়িঘর ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকতে হয়।

মন্ডল আলীর ভাষায়, ‘হামারগুলার ১২ মাসেই কষ্ট। ৬টা মাস যে ভালো থাকমো তাও পাই না। ভারত যে কী দুর্গতিতে ফেলাইছে হামাক বাবা।’

নজরুল ইসলাম নামে ওই এলাকার আরেক কৃষক বলেন, ‘আমি তিস্তার চরে প্রায় ৬ একর জমিতে বিভিন্ন ফসল আবাদ করেছি। ঠিকমতো পানি দিতে পারছি না। আগে যে জমিতে পানি দিতে ১ ঘণ্টা সময় লাগছে, এখন ২ ঘণ্টা লাগে। জমিতে কোনো রস নাই। এ ছাড়া যাতায়াতের বড় সমস্যা এখন। ফসলগুলো কীভাবে বাড়িতে আনব চিন্তায় বাঁচি না।’

এদিকে তিস্তার উজানে ভারতের অংশে নতুন দুটি খাল খনন ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহারের খবরে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিস্তাপারের মানুষ। এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ অংশে ৪০ কিলোমিটারব্যাপী প্রবাহিত এই নদীর দুই পাড়ের মানুষসহ কৃষি ও জীব-বৈচিত্র্যের ওপর।

কুড়িগ্রামের একুশে পদকপ্রাপ্ত আইনজীবী এস এম আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘নদী যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন একটা নদীর ওপর উজান ও ভাটির দুটো রাষ্ট্রেরই সমান অধিকার থাকে। তাদের প্রদেশিক সমস্যার কারণে পানি না পাওয়াটা আমাদের জীবনের জন্য একটা জটিলতা তৈরি করেছে।’

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ বিপ্লব কুমার মোহন্ত বলেন, ‘নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি কম থাকার কারণে আবাদ কিছুটা কম হচ্ছে। আবার যদি ভারতে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়, তাহলে তো পানিপ্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হবে এবং এখানকার কৃষি সেক্টরের উৎপাদন আরও কমে যাবে।’

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে কয়েক বছর থেকে তিস্তায় পানি থাকছে না, এটা এখন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে গেছে। আর ভারতীয় অংশে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আপনারা যা জানেন, আমি তা খবরে শুনেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত