(গতকালের পর)
সকাল ১০টায় রেডিও নতুন সামরিক আদেশের ঘোষণা দিল। যখনই কোনো সাংবাদিক সেনা কর্মকর্তাদের কাছে কোনো তথ্য জানতে চান, তাদের রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কূটনৈতিক মিশনে পৌঁছার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। এক দল সাংবাদিক যখন সামনের দরজা দিয়ে একজন ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলতে বেরিয়ে এলেন, ক্যাপ্টেন ভয়ংকর ক্ষুব্ধ হলেন। তাদের ভেতরে ঢোকার হুকুম দিয়ে পেছন থেকে বললেন, ‘আপনাদের কীভাবে সামলাতে হবে আমি জানি। আমি আমার নিজের মানুষদের হত্যা করতে পারি। আমি আপনাদেরও হত্যা করতে পারব।’
অল্পক্ষণের মধ্যেই সামরিক সরকার হোটেলে হুকুম পাঠাল, সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের মধ্যে হোটেল ত্যাগ করার জন্য সব বিদেশি সাংবাদিককে তৈরি থাকতে হবে। সাংবাদিকরা তাদের ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন, বিল শোধ করলেন। প্রেসিডেন্টের ভাষণের ঠিক পর পর ৮টা ২০ মিনিটে সামনে-পেছনে সৈন্যবোঝাই পাঁচটি ট্রাকের প্রহরায় তারা এয়ারপোর্টের দিকে বেরিয়ে পড়লেন।
যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একজন সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলেন, বিদেশি সাংবাদিকদের কেন চলে যেতে হবে?
‘আমরা চাচ্ছি আপনারা চলে যান, কারণ থাকাটা আপনাদের জন্য ভয়ংকর বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।’
হোটেলের সব কর্মচারী এবং হোটেলে অবস্থানকারী অন্য বিদেশিরা বিশ্বাস করে, সাংবাদিকরা একবার চলে গেলেই শুরু হবে হত্যাযজ্ঞ।
হোটেলের একজন কর্মকর্তা বললেন, ‘এটা আর হোটেল থাকবে না, এটা হয়ে উঠবে রক্তাক্ত হাসপাতাল।’
এয়ারপোর্টে সাংবাদিকদের লাগেজ খুব কড়াভাবে চেক করা হচ্ছে, বাইরে গোলাগুলির শব্দ; কিছু টেলিভিশন ফিল্ম, বিশেষ করে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের ফিল্ম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানে কামানের বিরুদ্ধে লাঠি ও বল্লম নয়াদিল্লি, ২৮ মার্চ (১৯৭১) : লাঠি-বল্লম ও স্থানীয়ভাবে তৈরি রাইফেল দিয়ে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বোমারু বিমান, বোমা, ট্যাংক ও ভারী কামান সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার করে তুলছে।
গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জিতে পূর্ব পাকিস্তানিরা সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা দাবি করলে, তা প্রতিহত করতে সেনাবাহিনী নামে। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক আইন প্রশাসনের গণসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক অবাধ্য বেসামরিক জনগণকে সামাল দিতে সেনাবাহিনীর কী ভূমিকা হবে, সে সম্পর্কে বিদেশি সাংবাদিকদের ব্রিফিং দিচ্ছিলেন।
লম্বা পশ্চিম পাকিস্তনি এ অফিসার বলেন, ‘কখন সেনাবাহিনী তলব করা হয়? এটাই হচ্ছে শেষ ভরসা। হত্যা করার জন্যই সেনাবাহিনী গুলি করবে।’
তার মন্তব্য ছিল ভবিষ্যদ্বাণীর মতো। দুই সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার রাস্তায় যে-ই বেরিয়েছে এমন যে কাউকে, জানালা দিয়ে যে প্রতিবাদী স্লোগান দিয়েছে এমন সবাইকে গুলি করে হত্যা করেছে। বাঙালিদের স্বশাসনের আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক জনতার ওপর সেনাবাহিনী কামান, মেশিনগান, রিকয়েললেস রাইফেল ও রকেট হামলা চালিয়েছে।
এটা নিশ্চিত মনে হচ্ছে, হাজার হাজার বাঙালিকে খুন করা হবে। কিন্তু তাদের স্বশাসন আন্দোলন এবং তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাদের যে আনুগত্য ও আত্মত্যাগ, তাতে এক হাজার মাইল দূর থেকে এসে কার্যত কোনো বিদেশি সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকাল পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না, এখন সে প্রশ্ন উঠে এসেছে।
সেনাবাহিনী এসেছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে, বড় বড় সব ব্যবসাও সেখানে কেন্দ্রীভূত; সেখানে মাথাপিছু আয় বেশি আবার দ্রব্যমূল্য পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে কম। সাড়ে পাঁচ কোটি পশ্চিম পাকিস্তানির সবকিছুই সাড়ে সাত কোটি পূর্ব পাকিস্তানির চেয়ে উত্তম।
বর্তমান সংবাদদাতাসহ বিদেশি সাংবাদিকদের শনিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের শরীর ও লাগেজ তল্লাশি করে ছবির ফিল্ম ও নোটবই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
ঢাকায় রাজনৈতিক আলোচনায় কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পরই সেনাবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ। কিন্তু যেসব টুকরো খবর আসছে, তাতে এটা স্পষ্ট, পাকিস্তানি ক্ষমতাশালীরা কখনই শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তনের জন্য লক্ষণীয় পরিমাপের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে না।
শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগ কার্যত জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে অসহযোগিতার অহিংস আন্দোলন চালিয়ে সামরিক আইন প্রশাসনের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করছেন। শেখ মুজিবের অনুসারীরা কতগুলো সরকারি দপ্তর দখল করে নিয়েছে, কতগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, হুকুম অমান্য করছে- এর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতিরক্ষা দপ্তরের বেসামরিক ব্যক্তিদের কাজে যোগদান সংক্রান্ত: হয় কাজে যোগ দিন, নতুবা ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করুন।
কিন্তু বাঙালিদের উচ্ছলতার দিন শিগগিরই ঘনিয়ে এল। প্রথম দিকে আলোচনায় কিছু অগ্রগতির খবর থাকলেও তা শ্লথ হয়ে এল এবং সেনা অভিযানের আশঙ্কা ও আতঙ্ক ছাপিয়ে উঠল।
প্রতিদিন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আসছে। বাঙালিদের অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ইচ্ছে করে সমঝোতা আলোচনা দীর্ঘ করা হচ্ছে, যেন এর মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক প্রস্তুতি ও সেনা মোতায়েন আরও জোরদার করতে পারে।
(উৎস : আন্দালিব রাশদীর বিদেশির চোখে ১৯৭১ ও একাত্তরের দশ বিদেশি সাংবাদিক)
(সমাপ্ত)
লেখক: অনুবাদক ও সাহিত্যিক
