ভাবার সময় নেই কর্তাদের

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৩, ০২:১৯ এএম

আন্তর্জাতিক খনি নিরাপত্তা দিবস আজ। খনিজসম্পদ এবং খনি শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতনতার উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় প্রতি বছরের ৪ এপ্রিল দিবসটি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হলেও বাংলাদেশে এ নিয়ে যেন ভাবার সময় নেই সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের। এমনকি তাদের অনেকেরই এ দিবস সম্পর্কে কোনো ধারণাও নেই।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৮৫ সালে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়াতে, ১৯৮৯ সালে রংপুরের খালাশপীর এবং ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় কয়লা খনি আবিষ্কার করে। বর্তমানে দেশে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিতে মাটির নিচে কাজ করছেন শ্রমিকরা। এ দুটি খনির দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) এবং মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড। বর্তমানে সেখান থেকে কয়লা ও পাথর উত্তোলন করা হয়।

বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলনকৃত কয়লা তুলনামূলক উন্নতমানের। এ খনি থেকে উত্তোলন করা কয়লা সেখানকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়।

প্রতি বছর খনি থেকে সম্পদ তুলতে গিয়ে সারা বিশ্বে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এশিয়াতে এ মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। এর মধ্যে চীনে খনিতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে কয়লা খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা রয়েছেন বড় ঝুঁকিতে। হাজার বছর আগে থেকে খনির সম্পদ ব্যবহার করে মানুষ তার জীবনযাত্রাকে এগিয়ে নিয়েছে। অথচ খনি শ্রমিকের দুর্দশা এখনো কাটেনি। নিরাপত্তার সঙ্গে বেশিরভাগ খনি শ্রমিক ন্যায্য পাওনা পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কয়লা খনিতে কাজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে অন্তত সাতজন মারা গেছেন। গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্বের তালিকায় রয়েছেন পাঁচজন। আর ছোটখাটো আহতের সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০।

খনি নিরাপত্তা দিবসের কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিসিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালিত হয়। কিন্তু খনি নিরাপত্তা দিবসের কথা এবারই প্রথম শুনলাম। এ দিবস কখনো পালন করা হয় না। কোনো ধরনের নির্দেশনাও আমরা পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘খনির নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কাজ করছি সারা বছর। খনিতে কাজ করতে গিয়ে যারা আহত হয়েছেন তাদের প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা এবং নিহতদের পরিবারকে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানির সিএসআর ফান্ড থেকে ৮-১০ বছর ধরে এ টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে কর্মরত চায়নিজ (চীনা) প্রতিষ্ঠান আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি নিহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এককালীন ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছে।’

১৯৭৪ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকায় ভূগর্ভের ১২৮-১৩৬ মিটার গভীরতায় গ্রানাইট পাথর আবিষ্কার করে জিএসবি। পরে একটি প্রকল্পের আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পাথর উত্তোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রকল্পটি মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) নামে যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ৪ আগস্ট।

এ বছর খনি নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য কী তা জানতে চাইলে এমজিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু দাউদ মুহম্মদ ফরিদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেপিআই অনুযায়ী আমরা নিরাপত্তা বিধান করব। দিবস সম্পর্কে আলাদা কোনো অনুষ্ঠান বা আলোচনা করা হচ্ছে না।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা বলে এ ধরনের কোনো দিবস বাংলাদেশে পালিত হয় না। তবে এটা গুরুত্বপূর্ণ দিবস। পরে এ দিবস পালন করা যায় কি না তা বিবেচনা করা হবে।’ সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত খনিতে হঠাৎ ধস এবং খনির মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে সেখানে কর্তব্যরতদের মৃত্যু হয়। এ জন্য খনিতে কাজ করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। পৃথিবীর সব খনিতে নামার আগে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় বলে স্বাক্ষর করে নামতে হয়। অর্থাৎ সার্বক্ষণিক ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় খনিশ্রমিকদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত