পৃথিবীর আকাশে রহস্যময় বস্তু বা ইউএফও বর্তমানে যা ইউএপি নামে পরিচিত- সংক্রান্ত গোপন নথি ও ভিডিওর তৃতীয় কিস্তি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন। গত মাসে সরকারিভাবে নতুন করে তথ্য প্রকাশের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তারই অংশ হিসেবে শুক্রবার (১২ জুন) এই নতুন নথিপত্র প্রকাশ করা হলো।
প্রকাশিত সর্বশেষ নথিপত্রে সিআইএ, এফবিআই, নাসা, প্রতিরক্ষা দপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার ৫৩টি নথি ও ১০টি ছবি রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ছয়টি ভিডিও ও নাসার তিনটি অডিও রেকর্ড। ভিডিওগুলোতে আকাশে অদ্ভুত সব গোলাকার বস্তুর উপস্থিতি দেখা গেছে। এছাড়াও প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে তৈরি কিছু ‘শৈল্পিক চিত্র’ প্রকাশ করা হয়েছে।

নতুন প্রকাশ করা ফাইলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হলো ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের দেখা রহস্যময় গোলকের ঘটনা। সে সময় পাঁচজন এজেন্ট আকাশে অদ্ভুত সব আলোকোজ্জ্বল গোলক দেখতে পান। এক এজেন্ট জানান, তখন তার সঙ্গী অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি এটা দেখতে পাচ্ছ?’
পেন্টাগনের নিজস্ব ইউএফও ওয়েবসাইটে আপলোড করা ফাইলগুলোর মধ্যে চারটি ভিডিও সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা। এর আগে সাধারণত সামরিক বাহিনীর ধারণ করা ফুটেজ প্রকাশ করা হতো, তবে এবার সাধারণ মানুষের দেখা ভিডিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এর মধ্যে জুলাই ২০২৫-এর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুটি উজ্জ্বল আলো আকাশে খুব মসৃণভাবে ও নিঃশব্দে চলাচল করছে। এফবিআই-এর ভাষ্যমতে, বস্তুগুলো অনেকটা গঠনবদ্ধ হয়ে বা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থেকে উড়ছিল। এছাড়া অক্টোবর ২০২৪-এর ‘অরবিস ওভার দ্য পন্ড’ নামক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পুকুরের উপরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে স্থির অবস্থায় একটি ‘প্লাজমা সদৃশ গোলক’ ভাসছিল। এটি মাঝে মাঝে আকার ও উজ্জ্বলতা পরিবর্তন করছিল এবং মূল গোলক থেকে ছোট ছোট আলোর বিন্দু বিচ্ছিন্ন হতে দেখা গিয়েছিল।
ফাইলের একটি অংশে ১৯৫২-৫৩ সালের সিআইএ গঠিত একটি প্যানেলের নথি রয়েছে। তৎকালীন প্যানেল জানিয়েছিল, ফ্লাইং সসার বা উড়ন্ত থালা কোনো শারীরিক হুমকি নয়। তবে জনমনে সৃষ্ট ইউএফও আতঙ্ক দূর করতে সে সময় ‘তথ্য ধামাচাপা’ বা ‘অস্বীকার’ করার নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া অক্টোবর ২০২৩-এর পশ্চিমাঞ্চলে ঘটা ধারাবাহিক অদ্ভুত ঘটনার বর্ণনাও রয়েছে এখানে। ৫ জন ফেডারেল এজেন্ট জানিয়েছেন, আকাশ থেকে লাল রঙের আলো মুহূর্তের মধ্যে ত্বরান্বিত হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে উড়ছিল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, একটি বড় কমলা রঙের আলো থেকে বারবার ছোট ছোট গোলক বেরিয়ে আসছিল, যা তার কাছে মনে হয়েছে ‘যেন বাস্কেটবল থেকে আঙুর বের হচ্ছে।’
ফাইলের অন্য একটি অংশে ২০০৮ সালে জিম্বাবুয়ের হারারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশে দেখা চাকতির মতো বস্তুর ঘটনা রয়েছে। এই বস্তুটি থেকে আলোর রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, যা নিয়ে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুম পর্যন্ত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০২২ সালে কলোরাডোতে দেখা ‘আলু আকৃতির’ অস্পষ্ট ও চকচকে বস্তুর ঘটনাটিও এখানে স্থান পেয়েছে, যা আজও অমীমাংসিত।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নির্বাহী আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পেন্টাগন এই নথিগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ইউএফও সংক্রান্ত বিষয়ে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে।
পেন্টাগনের এই উন্মুক্তকরণের ফলে ইউএফও বা মহাজাগতিক রহস্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে ‘সূর্যের আলোর প্রতিফলন’ বা প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, অনেক ঘটনা আজও রয়ে গেছে রহস্যের আড়ালে।
সূত্র: সিবিএস নিউজ