২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য ‘গণতন্ত্র, মানবিকতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি’ একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। এবারের বাজেটের শিরোনাম আকর্ষণীয় বটে , তবে এও মনে রাখতে বাঞ্ছনীয় যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান সংকটসহ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যথাযথ পরিকল্পনাই যথেষ্ট নয়, জরুরি হলো বাস্তবায়ন কৌশল ও বাস্তবায়নে নির্মোহ অবস্থান। এই বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ মোটের ওপর সঠিক হয়েছে, তবে এও বলা প্রাসঙ্গিক এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।
প্রশ্ন হলো, বাজেটে ঘোষিত এই দর্শন কতটা বাস্তবসম্মত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিফলন কতটা দেখা যায়? প্রথমত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণাটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত এক দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, আয় এবং সম্পদের বণ্টন ক্রমেই অসম হয়েছে। প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের মধ্যে একটি দৃশ্যমান ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ধারণা কেবল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভাতা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং অর্থনৈতিক সুযোগের ন্যায্য বণ্টন, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং সামাজিক গতিশীলতা নিশ্চিত করার মধ্যেই এর প্রকৃত অর্থ নিহিত।
বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বরাদ্দ বৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা বলে বরাদ্দ এবং ফলাফলের মধ্যে সবসময় সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। দুর্বল বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি প্রায়ই উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা, ব্যাগ ইত্যাদি সরবরাহের পরিকল্পনা ও প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা সাধুবাদযোগ্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষতাভিত্তিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে।
বর্তমান বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতির ওপর জোর। সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা বলেছে। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তবে বাস্তবতা হলো, দেশে এখনো বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে প্রভাবিত করছে।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখন পর্যাপ্ত বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারেনি। অথচ আমাদের জনমিতিক সুবিধা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো, রাজস্ব আহরণ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো উদ্বেগজনকভাবে কম। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা সংগ্রহ করতে না পারলে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। করের হার বাড়ানোর চেয়ে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ এবং কর ফাঁকি রোধের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এখনো কাটেনি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। এ কারণে শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৌশলগত খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন , ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’– নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্যে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থায় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা তিনি বলেছেন। বিদেশে কর্মসংস্থান সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিদেশে যেসব খাতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে খাতভিত্তিক বিশেষ কোর্স এবং আধুনিক পাঠ্যক্রম চালুর কাজ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, অ্যাক্রেডিটেশন প্রশিক্ষণের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। কিন্তু এসব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও যথাযথ অবস্থান জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও এই বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। খেলাপি ঋণ বহু বছর ধরে, বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাব আর্থিক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। তবে এই বাজেট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ বা সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি দিয়ে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব নয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা আগামী দিনের প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হবে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
এবারের বাজেটে সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতির বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতার যুগে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, পুনর্ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। একইভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। আমরা দীর্ঘদিন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছি। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থের চেয়ে দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা, বিপণন, হিসাবরক্ষণ কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পর্যাপ্ত জ্ঞান না
থাকায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারেন না। তাই সরকারের উচিত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, ব্যবসা উন্নয়ন সেবা এবং উদ্যোক্তা শিক্ষা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সবই আশার কথা। কিন্তু যদি বাস্তবায়ন অধরা থাকে তাহলে এ সব কিছুই কথার কথা হয়ে থাকবে যা অনভিপ্রেত। আমরা চাই, অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির আশানুরূপ প্রতিফলন। শুধু
কথার কথা হয়ে যেন না থাকে এসব। ২০২৬-২৭ সালের বাজেট সেই সম্ভাবনার একটি রূপরেখা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
আমরা যেন মনে রাখি, বাজেটের প্রকৃত সফলতা কাগজে-কলমে নয়, মানুষের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত চিত্র দৃশ্যমান করতে হয়। আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে যা ১৯ শতাংশ বেশি। আমাদের মনে আছে ,অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ঘোষিত চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখ্য, ব্যয়ের জন্য অর্থমন্ত্রী ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছেন যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে ১৮ শতাংশ বেশি। আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয় বাড়াতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে এবং এ জন্য এনবিআরের দক্ষতা ও কর্মকৌশল খুব জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব প্রীতিকর নয়।
একটি কথা খুব গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে যে, আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নির্ধারিত হবে না; বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, কতটা বৈষম্য কমাচ্ছে, কতটা মানবসম্পদ উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং কতটা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করছে তার ওপর নির্ভর করবে। সবশেষে বলা যায় সামগ্রিকভাবে বাজেটে আশাব্যঞ্জক দিক যে নেই, তা কিন্তু নয়। তবে একই সঙ্গে এও বলতে চাই, বাস্তবায়ন-কৌশল হতে হবে সঠিক। এক কথায় সাফল্য নির্ভর করবে, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা এবং উৎপাদনশীলতা ও সুষম উন্নয়নের দৃঢ়তার ওপর।
লেখক : কমনওয়েলথ স্কলার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়