উন্নয়ন নাকি টিকে থাকার লড়াই

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০২:৫২ এএম

শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির মূল কারণ? এটি আংশিক সত্য হলেও, বাস্তব নয়। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির বড় অংশ আসে Structural Inefficiency  থেকে, শুধু মজুরি বৃদ্ধি থেকে নয়। অর্থাৎ একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত কর্মচারীর বেতন কিছুটা বাড়লে, বাজার অস্থির হয় এই ধারণা বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে না। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার সিন্ডিকেট, আমদানি নির্ভরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বাজার তদারকির সীমাবদ্ধতা। ফলে বেতন বৃদ্ধি অনেক সময় মূল্যস্ফীতির কারণ নয়, বরং মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। বাস্তবে পে-স্কেল বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে লাইফ আপগ্রেড নয়, স্ট্যাটাস রক্ষায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে বেতন বৃদ্ধি প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হয়েছে। আয় বৈষম্য এবং মজুরি পতনের কারণে, বেতন বৃদ্ধির সুফল সীমিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে পে-স্কেল বৃদ্ধি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। 

বাংলাদেশে পে-স্কেল নিয়ে আলোচনার বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বেতনকে আমরা শুধু আয় হিসেবে দেখি সক্ষমতা নয়। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার Capability Approach-এ দেখিয়েছেন, মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে সে কী করতে পারছে এবং কী হতে পারছে তার ওপর। একজন ব্যক্তির মাসে ৭০ হাজার টাকা আয় হলেও যদি নিরাপদ চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা, সুস্থ পরিবেশ, মানসিক স্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা না পান তাহলে তার জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। কারণ এখানে আয় বাড়লেও, অনিশ্চয়তা কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চআয়ের অনিরাপদ মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হচ্ছে।

অনেকে মনে করেন বেতন বাড়লে, জীবনমান উন্নত হবে। কিন্তু বাস্তবতা জটিল। জীবনমান শুধু মাস শেষে কত টাকা হাতে আসে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং সেই টাকায় একজন মানুষ কতটা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছে, সেটিই মূল বিষয়। আধুনিক অর্থনৈতিক গবেষণা বলছে, জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো Economic Resilience বা আর্থিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের কয়েক মাস আয় বন্ধ থাকলেই, বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। এর অর্থ বেতন বৃদ্ধি তাদের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। এর অন্যতম কারণ হলো জীবনমান উন্নয়নে কেবল আয় নয়, ব্যয়ের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সরকারি কর্মচারী ২০১৫ সালে যে বেতনে পরিবার চালাতে পারতেন, ২০২৬ সালে একই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে তাকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে পে-স্কেল বৃদ্ধি এক ধরনের অর্থনৈতিক দুষ্টচক্রের অংশ হয়ে উঠেছে। বেতন বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক ব্যয়। এরপর আবার নতুন বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠে। কিন্তু এই চক্রের মধ্যেও মানুষের প্রকৃত জীবনমান খুব সামান্য উন্নত হয়। একজন মানুষ কাগজে-কলমে বেশি আয় করলেও বাস্তবে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও টেকসই জীবনযাপনের সুযোগ সীমিত রাখতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা। যদি একজন মানুষের বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ে কিন্তু একই সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায় তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন খুব সামান্য হয়।

গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় এবং ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেক চাকরিজীবী আগের তুলনায় বেশি বেতন পেলেও, সঞ্চয় করতে পারেন না। এই বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভিয়েতনামে এক সময় নিম্নআয়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল। কিন্তু উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা, আয় ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল থেকেছে এবং মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সরকার শুধু মজুরি বৃদ্ধি করেনি, পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক কম। পে-স্কেল ও মূল্যস্ফীতির অসামঞ্জস্য দূর করতে কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, দীর্ঘ বিরতিতে বড় আকারে বেতন বৃদ্ধি না করে প্রতি বছর সীমিত আকারে মূল্যস্ফীতি সামঞ্জস্য বেতন সমন্বয় চালু করা যেতে পারে। এতে বাজারে হঠাৎ চাপ তৈরি হবে না। দ্বিতীয়ত, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশে অনেক সময় প্রকৃত সংকট ছাড়াই কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। এটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি। চতুর্থত, বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ প্রয়োজন। পঞ্চমত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র যদি এসব খাতে কার্যকরী সহায়তা দিতে পারে, তাহলে মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। ষষ্ঠত, শ্রমবাজারে সামগ্রিক ভারসাম্যের জন্য বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে এবং সপ্তমত, দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে হবে।

পে-স্কেল বৃদ্ধিকে শুধু সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না, একে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ভবিষ্যতে জীবনমান উন্নয়নের জন্য পে-স্কেল বৃদ্ধির পাশাপাশি সমন্বিত অর্থনৈতিক সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বেতন বাড়ানো নয় বরং স্বাস্থ্য, আবাসন ও শিক্ষা ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন মানুষ মাস শেষে শুধু টিকে থাকে না নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে।

লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত