যাতায়াতে সাশ্রয়ী বাঁচবে সময়

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:২৮ এএম

ঘড়িতে সময় তখন দুপুর ১টা ২১ মিনিট। ভাঙ্গা স্টেশন থেকে পদ্মা সেতুর উদ্দেশ্যে প্রথমবারের মতো ঘুরতে থাকে ট্রেনের চাকা। পরীক্ষামূলক ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে উত্তেজনা আর অপেক্ষার পর শুরু হয় বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। বেজে উঠে বিখ্যাত গান যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই তবে...।

আনন্দে আত্মহারা হয়ে ট্রেনের মধ্যে নাচানাচি শুরু করেন অনেকেই। কেউবা ভিডিও করেন, দল বেঁধে ছবি তুলতে থাকেন কেউ কেউ। হুইসেলের শব্দে রেললাইনের পাশে ছুটে আসেন নারী-পুরুষ-শিশুরা। আনন্দচিত্তে হাত নেড়ে স্বাগত জানান তারা।

দুপাশের সবুজের ধানক্ষেত পেরিয়ে ধীরে ধীরে ছুটে চলা ট্রেন দেখতে রেলসড়কের বিভিন্ন স্থানে জটলা চোখে পড়ে। গৃহিণী থেকে শুরু করে স্কুলের ছেলেমেয়েরাও যোগ দেয় সেই জটলায়। দিগন্তজোড়া মাঠে দূরে দেখা মেলে কাজ ফেলে বিস্ময় চোখে তাকিয়ে আছেন কৃষকরা। অনেকে ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে কিংবা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আনন্দ উৎসবে অংশ নেন।

পরীক্ষামূলক চালু হওয়া ট্রেনের যাত্রী ছিলেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার হাজরাকান্দি চরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল জব্বার মিয়া। তিনি বলছিলেন, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা তথা দক্ষিণবঙ্গ অবহেলিত ছিল। পদ্মা সেতু চালুর পর এই এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। বাসের পর পদ্মা সেতুতে পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় উন্নয়নের মাইলফলকে আরও একধাপ এগিয়ে গেল।

‘বর্তমান পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা থেকে ঢাকায় যেতে বাসভাড়া লাগে আড়াইশ টাকা। ট্রেন চলাচল শুরু হলে একশ থেকে দেড়শ টাকা দিয়ে তুলনামূলক কম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানো যাবে। ভাঙ্গার যেসব বাসিন্দা ঢাকায় থেকে চাকরি করেন তারা তখন বাড়ি থেকে প্রতিদিন অফিস করতে পারবেন,’ যোগ করেন আবদুল জব্বার।

মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন জানান, ‘তরুণ বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। শেষ বয়সে এসে আজকে মনে হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের আরেকটি বিজয় হলো। নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।’

ভাঙ্গার ব্যবসায়ী বাদশা শরীফ জানান, ‘আমি ভীষণ আনন্দিত। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আনুষ্ঠানিক ট্রেন চলাচল শুরু হলে ভাঙ্গা থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কম খরচে, কম সময়ে নিরাপদে যাতায়াত করা যাবে। এটা ভাবতেই কী যে ভালো লাগছে তা বলে বোঝানো যাবে না।’

ভাঙ্গার পাতরাইল গ্রামের বাসিন্দা তৈয়ব আলী মাতবর বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু ঈদ উৎসব ও নানা কারণে সড়কপথে অনেক সময় যানজটের সৃষ্টি হয়। রেল চালু হলে কোনো ধরনের যানজট থাকবে না। তা ছাড়া এটি অন্যান্য যানের তুলনায় অনেক নিরাপদ।

বেলা ২টা ৩৬ মিনিটে ট্রেনটি যখন পদ্মা সেতুর সংযোগ রেলপথে ওঠে, তখন ট্রেনের স্বাভাবিক ঝিকঝিক শব্দ আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যায়। শুধু চাকার সঙ্গে লাইনের ঘর্ষণের একটা শোঁ শোঁ শব্দ আসছিল। কারণ সেখানকার ট্রেনলাইনে কোনো পাথর নেই। পাথরবিহীন রেলপথ দেশে এটিই প্রথম। ট্রেনটি মূল সেতুতে ওঠার সময় আতশবাজি ফোটানো হয়। প্রায় ৪২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ট্রেনটি যখন মাওয়া স্টেশনে পৌঁছায় ততক্ষণে ঘড়িতে বেজে গেছে বিকেল ৩টা ১৮ মিনিট।

যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরসের নতুন ইঞ্জিনটি চীন থেকে আনা চকচকে লাল-সবুজ সাতটি বগিকে পরীক্ষামূলক যাত্রায় ধীর গতিতে টেনে নিয়ে পদ্মা পার করে। ট্রেনটিতে যাত্রীর ধারণক্ষমতা ছিল ৪৪৯ জন।

এই রেলপথে দ্রুতগতিতে ট্রেন চালানো যাবে উল্লেখ করে রেলওয়ের একজন প্রকৌশলী বললেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পাথরবিহীন রেলপথ দিয়ে ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলতে পারে। পদ্মা সেতুতে এর গতি নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার।

ট্রেনে ওঠার আগে শরীয়তপুরের জাজিরা রেলস্টেশনে কথা হয় উপজেলার চরলক্ষ্মীকান্তপুর গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ন সাধুর সঙ্গে, যিনি রাজবাড়ী যাওয়ার উদ্দেশে ট্রেনের অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, গ্রামের বাড়ি থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে কাঁঠালবাড়িয়া ঘাট এলাকার রেলস্টেশনে আসতে তার খরচ হয়েছে ১০০ টাকা। পদ্মা সেতুর ওপর ট্রেন চলাচল শুরু হলে তিনি তার বাড়ি থেকে নিকটবর্তী স্টেশনে পৌঁছে যাবেন মাত্র ৩০ টাকায়। যাতায়াত খরচ কমার পাশাপাশি সময়ও সাশ্রয় হবে।

ইতিহাসে নাম লেখালেন রবিউল আলম : ভাঙ্গা স্টেশন থেকে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক ট্রেন চালিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন ট্রেনচালক রবিউল আলম। ঈশ^রদীতে ৭৩ জন ট্রেনচালকের মধ্য থেকে তাকে বেছে নেওয়া হয়। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদরে। ১৯ বছর আগে সহকারী ট্রেনচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। রবিউলের সহকারী চালক ছিলেন আরিফুর রহমান।

নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে রবিউল জানান, এক সপ্তাহ আগে যখন শুনলাম এই ট্রেনের চালক হতে যাচ্ছি, তখন থেকেই ভেতর থেকে উত্তেজনা আর ভালো লাগা কাজ করতে থাকে। আমি গর্বিত। আমার পরের প্রজন্মও এ নিয়ে গর্ববোধ করবে। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত