পুঁজিবাজারে মন্দাভাব অব্যাহত থাকলেও কারসাজি থেমে নেই। একশ্রেণির বিনিয়োগকারী স্বল্প মূলধনি কোম্পানির মালিকপক্ষের সহায়তায় সংশ্লিষ্ট শেয়ার নিয়ে কারসাজি চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এমন অন্তত সাত কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। গত দুই সপ্তাহে এসব কোম্পানির কোনো কোনোটির দর দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। যদিও মৌলভিত্তির প্রায় সব কোম্পানির শেয়ার এখনো ফ্লোর প্রাইসে আটকে আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত শেয়ার হচ্ছে লিগ্যাসি ফুটওয়্যার। মাত্র ১২ কার্যদিবসে এ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। দাম বাড়াতে বাজারে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর তথ্য আগাম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বল্প মূলধনি ও লোকসানি এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ১৩ কোটি টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন শেয়ার ইস্যু করে মূলধন ৩০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হবে, বাজারে এমন তথ্য ছেড়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়েছে। ফলে গত ২০ মার্চ থেকেই শেয়ারটির দর বাড়তে শুরু করেছে। এর আগেই শেয়ার কিনে পজিশন নিয়েছে কারসাজির সঙ্গে জড়িত কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি। শেয়ারের দাম বাড়াতে কোম্পানির সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ রয়েছে। গত ১৯ মার্চ লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের শেয়ারের দাম ছিল ৪২ টাকা ৩০ পয়সা, যা গত মঙ্গলবার ৯২ টাকা ৪০ পয়সায় উন্নীত হয়। এরপর গতকাল কিছুটা সংশোধন হয়ে ৮৯ টাকা ৬০ পয়সায় নেমেছে।
এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প মূলধনি কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে। এসব শেয়ার আমাদের নজরদারিতে রয়েছে এবং লেনদেন কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, দাম বেড়ে যাওয়া শেয়ারগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, দর বৃদ্ধির একপর্যায়ে এসব শেয়ারে প্রলুব্ধ হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা জড়িয়ে পড়ছেন।
গত ছয় কার্যদিবসে জেমিনি সি ফুডের শেয়ার দর বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। এই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত ২৮ মার্চ এই শেয়ারের দর ছিল ৪৫৬ টাকা ৭০ পয়সা। এরপর টানা ছয় কার্যদিবসে দর বেড়ে গতকাল তা ৬৬৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। টানা দুই বছর লোকসানে থাকার পর হঠাৎ করেই ২০২১-২২ হিসাববছরে কোম্পানিটির মুনাফায় উল্লম্ফন দেখা দেয়। সর্বশেষ হিসাববছরে শেয়াররপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়ায় ১২ টাকা। কোম্পানির গত কয়েক বছরের ইতিহাসে এত বিপুল মুনাফা দেখা যায়নি। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুনাফা আরও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) জেমিনি সি ফুডের ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ১০ পয়সায়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সালের ৮ জুন জেমিনি সি ফুডের শেয়ারের দাম ছিল ১৩৯ টাকা। এরপর আয় বৃদ্ধির আগাম সংবাদ ছড়িয়ে দিয়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দর টানা বাড়ানো হয়। ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর শেয়ারটির দর ৫৬১ টাকায় টেনে তোলা হয়। এরপর সাময়িক বিরতিতে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ১৪১ টাকায় নেমে আসে। গত ২৭ মার্চ থেকে নতুন উদ্যমে জেমিনি সি ফুডের শেয়ারের দর বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা গতকাল ৬৬৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। শেয়ারের এই দর কোম্পানিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ইনটেক অনলাইনের শেয়ার দর গত নয় কার্যদিবসে ২৮ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। দুর্বল মৌলভিত্তির এই কোম্পানি ২০২২-২৩ হিসাববছরের কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ২০২১-২২ হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৫৪ পয়সা। কারসাজির কারণে গতকালও কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে গত ২২ মার্চের পর ২০ টাকা ৯০ পয়সা থেকে অব্যাহতভাবে দর বেড়ে গতকাল তা ২৬ টাকা ৮০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।
রহিম টেক্সটাইল গত দুই কার্যদিবসে বেড়েছে ১৪ শতাংশের বেশি। এর বাইরে গত দুই মাসে স্বল্প মূলধনি সোনালি আঁশ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, সমতা লেদার কমপ্লেক্স, বিডি অটোকারস ও আলহাজ¦ টেক্সটাইলের শেয়ার দর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এক বছরের বেশি সময় আগে স্বল্প মূলধনি ৬৪ কোম্পানিকে তাদের পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে নির্দেশনা দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এরপর থেকেই স্বল্প মূলধনির শেয়ারগুলো নিয়ে কারসাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা শেয়ারের দর বৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছেন বলে খোদ এসইসির কর্মকর্তাদের আশঙ্কা। তবে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা বেনামে কিংবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কারসাজিতে জড়িত থাকায় এসইসি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
