আশ্রয়হীনের আশ্রয় সিন্ধুতাই সাপকাল

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ১২:০৯ এএম

অনাথ শিশু থেকে অসহায়-নিঃস্ব বয়োবৃদ্ধ, স্বামী পরিত্যক্তা কি বিধবা, গৃহহীন নারীÑ  সবার আশ্রয় সিন্ধুতাই সাপকাল। মা হয়ে যেকোনো আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া, মুখে আহার তুলে দেওয়া, শিশুদের শিক্ষা, অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া তার জীবনের ব্রত। ঘর হারানো, পরিবার থেকে বিতাড়িত এই সংগ্রামী নারী নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি করতে পারেন আশ্রয় হারানোর বেদনা, তা নিজেই হয়ে উঠেছেন হাজারো আশ্রয়হীনের আশ্রয়। লিখেছেন এনাম-উজ-জামান বিপুল

সদ্য স্বাধীন ভারত তখন দেশভাগের ক্ষতে জর্জরিত। এমন এক উত্তাল সময়ে মারাঠা প্রদেশের ওয়ার্দা বিভাগে ১৪ নভেম্বর, ১৯৪৮ সালে গরু-মহিষ চরিয়ে জীবিকা নির্বাহকারী এই দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সিন্ধুতাই সাপকাল। দরিদ্র পরিবারে কন্যাসন্তান প্রত্যাশিত ছিল না তাই বাবা-মা ডাকতেন মারাঠি শব্দ ‘ছিন্দি’ নামে, যার অর্থ ‘ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো’। মা চাইতেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আপদ বিদায় করতে। কিন্তু বাবা জানতেন শিক্ষার গুরুত্ব। তিনি দেখেছিলেন গ্রামের হর্তাকর্তারা নিজেদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠায়, পড়ালেখা শেখাতে এমনকি শহরেও পাঠায়। তাই বাবা ‘অভিমানজি সাথে’ মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। মায়ের মত না থাকায় বাবা আর মেয়ে বিষয়টি মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখলেন। সিন্ধুতাই গরু চরানোর নাম করে ক্লাস করতেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মা জানতেন মেয়ে বাবাকে গরু চরাতে সাহায্য করছে। এই লুকোচুরি চলল পাঁচ বছর। সিন্ধুতাইয়ের বয়স যখন মাত্র ১০ বছর তখন মা আর কোনো যুক্তিতেই তাকে ঘরে রাখতে রাজি হলেন না। সিন্ধুতাইয়ের বিয়ে হয়ে গেল একই বিভাগের ৩০ বছর বয়সী হারবাজি সাপকালের সঙ্গে। শুরু হলো আরেক জীবন।

মারাঠার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যৌতুক ছাড়া বিয়ে হতো না। সিন্ধুতাইয়ের বাবা সাধ্যমতো যৌতুক কবুল করে মেয়েকে পাত্রস্থ তো করলেন কিন্তু পাত্রের যৌতুকের ক্ষুধা দিন দিন বাড়তে থাকে। বাবার অবস্থা বুঝে সিন্ধুতাই চেষ্টা করতেন নিজে পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে সংসারে সচ্ছলতা আনতে। বাধা পান সেখানেও। তিনি চেষ্টা করেছিলেন গরুর গোবর সংগ্রহ করে শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি তৈরি করে অর্থোপার্জনের। কিন্তু ওই গ্রামের অন্য নারীরা আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহজভাবে নিল না। তারা তার নামে কুৎসা ছড়াল। যৌতুক না আনার কারণে আর দুশ্চরিত্রা বদনাম দিয়ে স্বামী নির্যাতন করতে শুরু করল। এভাবেই কেটে গেল দশটি বছর। এর মধ্যেই হয়েছেন তিন সন্তানের জননী।

সিন্ধুতাই অত্যাচার যত সহ্য করেন ততই যেন স্বামীর জেদ, ক্রোধ বাড়তে থাকে। স্বামী তখন প্রতিজ্ঞা করেছেন পণ না পেলে সিন্ধুতাইকে বাড়িছাড়া করবেন অথবা মেরেই ফেলবেন। তারপর আবার বিয়ে করে হলেও পণ আদায় করবেন। একদিন প্রচ- প্রহারে সিন্ধুতাই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। বাড়ির সবাই তাকে মৃত ভেবে গোয়ালঘরে রেখে এলো। এ সময় সিন্ধুতাই ছিলেন সন্তানসম্ভবা। অজ্ঞান অবস্থায় তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু কেউ ছিল না সন্তানের নাড়ি কাটার। জ্ঞান ফেরার পর নিজেই পাথর দিয়ে আঘাত করে করে নাড়ি কাটেন। ক্ষুধার জ্বালায় অসুস্থ শরীর নিয়েই রওনা হন বাবার বাড়ি। কিন্তু সেখানেও আশ্রয় পেলেন না তিনি। একমুঠো খাবার, একটু আশ্রয়ের জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। পাননি। যাকে বাবা-মা আশ্রয় দেয়নি তাকে আশ্রয় কেন দেবে গ্রামবাসী? দুর্দিনে দুটি বাড়তি পেট ভরার দায়িত্ব কেউ নিতে চায়নি। পথে দু-একজন যা সামান্য সাহায্য করেছে তা দিয়েই পেট ভরার চেষ্টা করেছেন। একদিন দেখেন শবযাত্রার পথে ছড়ানো হচ্ছে খাবার। খাবার কুড়োতে কুড়োতে পৌঁছে গেলেন শ্মশানে। দেখেন শবদেহ পোড়ানোর পর আত্মার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কিছু খাবার। সবাই চলে গেলে সেই খাবার কুড়িয়ে খেলেন। সেই থেকে শ্মশান হলো তার আশ্রয়। আর মৃতদেহের ভস্মের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া খাবার হলো তার আহার। কিন্তু প্রতিদিন তো এই খাবার পাওয়া যেত না। কোলের সন্তান দিন দিন বড় হচ্ছে। তার জন্য আরও খাবারের দরকার। কন্যার হাত ধরে আবার নামলেন পথে।

শ্মশান ছেড়ে সিন্ধুতাই আশ্রয় নিলেন শিকড়দাঁড়া রেলস্টেশনে। রেলযাত্রী বা স্টেশনের মানুষের ফুটফরমাশ খেটে দু-একটা পয়সা যা পাওয়া যেত তা দিয়েই খাবার কিনে খেতেন। একদিন তিনি এক ভিখারিকে ট্রেনে গান গেয়ে ভিক্ষে করতে দেখেন। সেদিন থেকে তিনিও স্টেশনে গান গেয়ে ভিক্ষে করা শুরু করলেন। কিন্তু টিকতে পারলেন না। স্টেশনের কুলি, দোকানদার, কর্মচারীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভাবলেন আত্মহত্যা করবেন। মেয়েকে জোর করে জড়িয়ে ধরে রেললাইনে শুয়ে পড়লেন। সিন্ধুতাই জানতেন না সেদিন ছিল রেল ধর্মঘট। সেদিনের মতো বেঁচে গেলেন। পরদিন আবার গেলেন আত্মহত্যা করতে। হঠাৎ শুনতে পেলেন কচিকণ্ঠে কান্নার শব্দ। কাছে দেখেন মরাগাছের নিচে বসে একটা শিশু কাঁদছে। গাছটির একটি ডাল কোনো রকমে ভেঙে গাছের সঙ্গে লেগে আছে। সেই ভাঙা ডালেই আবার পাতা হয়েছে। ফুল ফুটেছে। ছেলেটি সেই ডালের ছায়ায় বসে কাঁদছে। তিনি ভাবলেন ভেঙে যেতে যেতে টিকে থাকা গাছে যদি পাতা গজায়, ফুল ফোটে, সেই ভাঙা গাছের ডাল আবার ছায়া দিয়ে মানুষকে আশ্রয় দেয় তবে তার এই জীবনটা কি শুধুই অর্থহীন। মৃত্যুচিন্তা ত্যাগ করলেন। ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলেন স্টেশনে। ভাগাড় থেকে খাবার খুঁজে খাওয়ালেন। স্টেশনে গান গেয়ে ভিক্ষা করেন। যত টাকা আয় হয় সেগুলো দিয়ে খাবার কিনে রাতে রান্না করেন। শিশু দুটোকে নিয়ে খান। স্টেশনে আরও কিছু শিশু জুটে গেল। রাতে খাওয়ার সময় তারাও আসে। সবাইকে সমান ভাগ করে দেন। পিতা-মাতাহীন শিশুগুলোও যেন মা খুঁজে পায়।

সিন্ধুতাই একদিন স্টেশনে একটি ব্রিফকেস কুড়িয়ে পেয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে জমা দেন। ব্রিফকেসের মালিক ব্রিফকেসটি পেয়ে খুবই খুশি হন। ভদ্রলোক দেখা করতে এসে সিন্ধুতাইকে উপহার দিতে চাইলে তিনি জানান, তিনি কোনো উপহার চান না। যদি কিছু দিতেই চান তাহলে এই অনাথ শিশুদের জন্য একটা ঘর বেঁধে দিন। এই ঘরেই শুরু হলো তার জীবনের আরেকটি অধ্যায়।

অনাথ শিশুদের নিয়ে থাকার একটা ঘর পেলেন। বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। শিশুদের প্রতি তার এই ভালোবাসা দেখে অন্যরাও এগিয়ে এলো। ঘর বড় হলো। যাদের পৃথিবীতে আর কেউ নেই এমন সব শিশু তার কাছে আশ্রয় পেল। সিন্ধুতাইয়ের কাছে প্রতিটি শিশুই সমান প্রিয়। যেন নিজের মেয়ের ওপর কোনো পক্ষপাত না ঘটে সেজন্য তাকে দিয়ে দিলেন শ্রীমন্তই দাগদু শেঠ হালুয়াই ট্রাস্টের অনাথ আশ্রমে। তিনি কিছু নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবককে দায়িত্বই দিলেন অনাথ, অসহায় শিশুদের তার অনাথ আশ্রমে আনার জন্য। মানুষের সহায়তায় দিন দিন বড় হতে থাকে তার অনাথ আশ্রম আর বাড়তে থাকে শিশুদের সংখ্যা। শুধু শিশু কেন, অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও।

একদিন সিন্ধুতাই দেখেন একজন বৃদ্ধ, জীর্ণ-শীর্ণ লোক তার কাছে এসে আশ্রয় চাইছে। বৃদ্ধকে তিনি আশ্রয় দিলেন। স্নান করালেন। খাবার খাওয়ালেন। ডাক্তার চিকিৎসা করল। বৃদ্ধ তাকে চিনল না। তিনি বৃদ্ধকে চিনলেন। এই বৃদ্ধ ছিল তার স্বামী যে তাকে মেরে গোয়ালঘরে ফেলে রেখেছিল। তিনি তাকে বললেন, তুমি এখানে থাকতে পারো। কিন্তু স্বামী হিসেবে না। সন্তান হিসেবে। আর সবার মতো।

নিঃস্বার্থ সেবার জন্য পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ, তথ্যচিত্র। তার জীবনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। নির্মিত হয়েছে ‘মি সিন্ধুতাই সাপকাল’ নামের মারাঠি চলচ্চিত্র। সিন্ধুতাইয়ের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করেছে।

সিন্ধুতাইয়ের রয়েছে হাজারেরও বেশি সন্তানের এক বিশাল পরিবার। এ পরিবারে কৃতী সন্তানের কমতি নেই। চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, শিক্ষক সব পেশার মানুষই রয়েছে। অনেকে নিজেদের অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছেন। সিন্ধুতাইয়ের আদর্শকে বুকে ধারণ করে মানবতার সেবা করে চলেছেন তারা। কারণ তাদের মা বলেছেন, ‘চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ হওয়া ভালো, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দরকার ভালো মানুষ হওয়া।’ মানুষ মানুষের জন্য ব্রত নিয়ে যারা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার সংগ্রামে রত সিন্ধুতাই সাপকাল তাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত