চীন-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তার কিছু নেই

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩, ১০:১৫ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র খুব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে এমন দুটি অঞ্চলে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে দারুণ কূটনৈতিক অগ্রগতি করেছে চীন-মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপ।

গত নভেম্বরে বেইজিং ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের জন্য দোহার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এটি এখন পর্যন্ত কাতারের সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদের চুক্তি। এ চুক্তি এমন সময়ে হলো যখন কিনা যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের নিজেদের গ্যাস সরবরাহ সুরক্ষিত করার জন্য হিমশিম খাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতেই চীন ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি ‘শান্তি পরিকল্পনা’ পেশ করে। এর মাধ্যমে নিজেকে একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরে দেশটি।

তারপরে আবার মার্চের শুরুতেই চীন সৌদি-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতা করে যার ফলে দুই পুরনো বৈরী প্রতিবেশীর মধ্যে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়গুলো মার্কিনিদের বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশেষ করে বেইজিংয়ের সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের সম্পৃক্ততা নিয়ে।

কিন্তু ওয়াশিংটনকে স্বীকার করতে হবে, ওবামা প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কূটনৈতিক পরিকল্পনাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রস্থান সম্পর্কে এই অঞ্চলে শঙ্কার জন্ম দিয়েছিল। মার্কিন কূটনীতির তখনকার মনোযোগ ছিল এশিয়াকেন্দ্রিক।

আর শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোই চিন্তিত নয়। এই নিবন্ধের দুই লেখকের একজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগে ইরাকে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত ইরাকের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর মনোযোগের অভাবকে (সাম্প্রতিককালে) ‘বিপর্যয়কর অবহেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যার মূল্য চড়া। ওই কূটনীতিক বলেছিলেন, ‘চীন এখন পশ্চিমারা যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে তা পূরণ করার চেষ্টায় ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে।’

মার্কিনিরা এখন এটা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে যে, ‘এশিয়াকে তাদের কূটনীতির কেন্দ্র’ করার অর্থ পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস করা নয়। তবে চীনের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের খুব বেশি আচ্ছন্ন হওয়া উচিত নয়, কারণ এটি এখনো বেশ ভাসা ভাসা। যুক্তরাষ্ট্রের বরং বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত বেইজিংয়ের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা এবং এই অঞ্চলে তারা যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে তা নিয়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি রাষ্ট্রের মধ্যে চারটির সঙ্গেই চীনের বাণিজ্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এটি ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। তবে তাদের অবশ্যই বুঝতে হবে, চীন-উপসাগরীয় সম্পর্কের মূলে রয়েছে বেইজিংয়ের বিশাল জ্বালানি চাহিদা।

অন্য কথায়, তাদের মধ্যে এই সম্পর্ক কৌশলগত নয় বরং প্রধানত লেনদেনমূলক।

চীনা পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রতিক সৌদি-ইরান চুক্তির অর্থ হতে পারে যে, চীন মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা আরেক ধাপ বাড়িয়ে আঞ্চলিক প্রভাবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন অবস্থানকে অতিক্রম করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হবে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ নিরাপত্তা অংশীদার। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দেশটি তার বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যার মধ্যে সামরিক ছাড়াও রয়েছে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক সম্পর্ক।

২০২১ সালে ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে চীনা সামরিক ঘাঁটি দ্রুত গুটিয়ে নেওয়া এই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

বিপরীতে ইসরায়েল ১৯৮০-এর দশক থেকে চীনের সঙ্গে বিস্তৃত প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি এ অভিযোগও উঠেছে যে, ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো বেইজিংয়ের কাছে সংবেদনশীল উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে। যদিও মার্কিন চাপে এসব বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

ইসরায়েল অবশ্য এরপরও চীনা কর্র্তৃপক্ষের কাছে স্পাইওয়্যার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। দেশটি তার প্রযুক্তি খাতে বড় চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে যা ২০১৮ সালে সাড়ে ৩২ কোটি ডলারে ওঠে। অনেক দিন ধরেই ইসরায়েলি সরকার দ্বৈত উদ্দেশ্যে (সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে) ব্যবহার উপযোগী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি ওয়াশিংটনকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে।

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে চীন ও ইসরায়েলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২৩শ কোটি ডলারে পৌঁছে। চীনা কোম্পানিগুলো হাইফার কাছে একটি কৌশলগত বন্দরের মতো বিভিন্ন বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের দরপত্র জিতেছে। এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। সেখানে নোঙর করা মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর ওপর চীনা গোয়েন্দাগিরির সম্ভাবনায় তারা উদ্বিগ্ন।

চীন ও ইসরায়েল সরকার একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা করছে। স্বাক্ষরিত হলে এটিই হবে মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরনের প্রথম চুক্তি।

অন্যভাবে বললে, ইসরায়েল চীনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে রয়েছে। আর দেশটি এমন সব কার্যক্রমে যুক্ত যা বেইজিংয়ের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি চুক্তির চেয়ে মার্কিন স্বার্থের জন্য অনেক বেশি হুমকিস্বরূপ।

এছাড়া ইসরায়েল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারীর ভূমিকা পালন করেছে। এটি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। ইসরায়েল ইরানের মাটিতেও হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। অথচ ইসরায়েলেরই মিত্র যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে অনেক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তেহরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ওয়াশিংটনের নিজের প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে চীনের মধ্যস্থতায় হওয়া সৌদি-ইরান চুক্তিকে নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে চীনা প্রভাব রোধ করতে চাইলে তার উচিত হবে ইসরায়েলের দিকে নজর দেওয়া, উপসাগরের দিকে নয়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বজায় থাকলে তা মিত্রের নির্ভরযোগ্যতা এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা ও অর্থনৈতিক আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান এ উভয় দিক থেকে পরস্পরের জন্য উপকারী হবে। মার্কিনিদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে ইসরায়েলিদের সঙ্গে তারা যেভাবে কথা বলে আরবদের সঙ্গেও সেভাবে কথা বলা অর্থাৎ কিনা সমান অংশীদার হিসেবে।

লেখক: সুলতান বারাকাত কাতার ফাউন্ডেশনের হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক

লক্ষ্মী বেনুগোপাল মেনন কাতার ইউনিভার্সিটির গালফ স্টাডিজ সেন্টারে পিএইচডি শিক্ষার্থী

আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত