প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তার দলের নেতাদের আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে দলকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যেকোনো ধরনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। অনেকেই এমন গতিতে একটি দেশের অগ্রগতি চায় না, তাই তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে।’ আওয়ামী লীগের সারা দেশের জেলা শাখার নেতাকর্মীরা গতকাল গণভবনে দেখা করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ২০০৯ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর পরিশ্রমের কারণে দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৪১ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং অতি-দরিদ্রের হার ২৫ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, তার সরকার দ্রুততম সময়ে দারিদ্র্যের হার আরও ২ বা ৩ শতাংশ কমিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে আরও গতিশীল করবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো অতি-দরিদ্রতা থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, তার সরকার বিনা খরচে বাড়ি প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং দেশবাসীর অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ সবকিছুই করছে।
জাতীয় নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগকে আরও শক্তিশালী করে জনগণের কল্যাণে আরও সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আওয়ামী লীগের সংগঠন আরও শক্তিশালী হোক।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীন করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাই আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি দলীয় নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করতে হবে। কারণ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক স্বৈরশাসকের পকেট থেকে গঠিত হয়েছিল।
গত ১৪ বছরে দেশের সার্বিক উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো প্রতিটি খাতে বাংলাদেশ ব্যাপক উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছে।
পদ্মা সেতুর সুফল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পেলেও বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছে না বলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেতা ও তাদের সমমনাদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি আরও বলেন, ‘তারা কোনো উন্নয়ন দেখছে না। তারা প্রতিদিনই এমন কি রমজানের দিনেও উচ্চকণ্ঠে মিথ্যা কথা বলছে। কেন তারা এমন করছে, আমি তা বুঝতে পারছি না।’
তৃণমূলের নেতাদের চার নির্দেশনা : আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দলের প্রধান চারটি নির্দেশনা দেন। নির্দেশনাগুলো হলো যেকোনো মূল্যে কী পেলাম, কী পেলাম না এটি ভুলে সর্বোচ্চ ঐক্য থাকতে হবে। দলকে শক্তিশালী করতে হবে ও বসে না থেকে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, এখন থেকেই মানুষের দুয়ারে যেতে হবে। তাদের কাছে ভোট চাইতে হবে। কেন আওয়ামী লীগকে ভোট দেবেন সেটা তুলে ধরতে হবে। সরকারের উন্নয়ন মানুষের কাছে তুলে না ধরলে তারা তা ভুলে যাবে। মনে রাখতে হবে প্রচারেই প্রসার। প্রধানমন্ত্রী ওই বৈঠকে আরও বলেন, আমরা সত্যটুকু জনগণের দরজায় গিয়ে তুলে ধরতে পারলে জনগণ আমাদের ফেরাবে না।
বৈঠকে দলীয় সভাপতি আরও বলেন, অনেক চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবেও হবে। কারণ একটা দেশ এত দ্রুত এত উন্নতি করুক অনেকে তো এটা চায় না। কাজেই তারা তাদের দিক থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করেই যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা এটা যেন অব্যাহত থাকে, সেটা মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে।’
গণভবনে খুলনা, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি ও পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। দলীয় কোন্দলপূর্ণ জেলাগুলোর নেতাদের সঙ্গে শুরু হওয়া এই বৈঠক ধারাবাহিকভাবে করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। মূলত দলীয় ঐক্য, দলের শক্তি বৃদ্ধি, সদস্য সংগ্রহ অভিযান গুরুত্বসহকারে শুরু করা ও বসে না থেকে জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মানুষের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে নেতাকর্মীদের ঢাকায় ডেকে নির্দেশনা দিতে শুরু করেছেন শেখ হাসিনা।
সরকার সব ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার দল আওয়ামী লীগ যখনই সরকারে থাকে, সব ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে সব সময় কাজ করে। বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা গতকাল গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী নেতৃবৃন্দকে বলেন, ধর্ম যার যার কিন্তু উৎসব সবার। তিনি বলেন, তার সরকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সাখাওয়াত মুন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্তের নেতৃত্বে বৈঠকে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশে চাকরি, নিয়োগ, পদোন্নতির মতো সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হয়েছে। তারা বিভিন্ন ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় রীতি পালন করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্মল কুমার চ্যাটার্জি উপস্থিত ছিলেন।
