ব্যতিক্রমী শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাযুত তারবিয়াহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালক। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে মুফাসসিরে কোরআন হিসেবে দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাপক দ্বীনি খেদমত করছেন। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন কোরআন তাফসিরের মূলনীতি, ওয়াজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-প্রয়োজনীয়তা এবং বক্তার করণীয়-বর্জনীয় নানা বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
দেশ রূপান্তর : কোরআন তাফসিরের জন্য কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখা দরকার?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : কোরআন মাজিদ হচ্ছে দ্বীনের সব জ্ঞানের উৎস। দ্বীন, দুনিয়া ও আখেরাতের সব কল্যাণ এর মাধ্যমে অর্জিত হয়। কোরআন নাজিল হয়েছে এর বিধান অনুযায়ী আমল করার জন্য। আর আমলের জন্য কোরআন বোঝা ও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ কোরআন বোঝার জন্য যোগ্য ও অভিজ্ঞ মুফাসসিরদের (কোরআনের ব্যাখ্যাকার) দারস্থ হন। তাদের তাফসির শুনে কোরআন বোঝার চেষ্টা করেন। তাই মুফাসসিরদের অবশ্যই শরিয়ত বর্ণিত মানদ-ের আলোকে তাফসির করতে হবে। কোরআন তাফসিরের নিয়ম-নীতি ও পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : সেই পদ্ধতিগুলো কী?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : প্রথমত, কোরআনের তাফসির কোরআন দিয়ে করা, তারপর হাদিস দিয়ে এবং তারপর সাহাবাদের বক্তব্যের মাধ্যমে। সবচেয়ে উত্তম হলো কোরআন দিয়ে কোরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা করা। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা দেওয়া। কোরআন-সুন্নাহ দিয়ে তাফসির করা না গেলে তাফসির করতে হবে সাহাবাদের বক্তব্যের মাধ্যমে। কেননা তারাই কোরআন নাজিলের অবস্থা ও প্রেক্ষাপট সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন, যা অন্যরা করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত কোরআন নাজিলের কারণ ও প্রেক্ষাপট জানা। সেই সঙ্গে আকাবির আহলুস সুন্নাহ উলামাদের প্রণীত তাফসির অনুসরণ করা। যে তাফসিরগুলোতে তারা অভিজ্ঞতার আলোকে চিন্তা-ভাবনা করে নানা বিষয় যুক্ত করেছেন, এর দ্বারা জাতি উপকৃত হচ্ছে ব্যাপকভাব। যেমন ধরুন, আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত একাধিক খন্ডের আরবি, উর্দু, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষার প্রায় চল্লিশটি তাফসির রয়েছে। আমি সেগুলো নিয়মিত অধ্যয়ন করি। একজন মুফাসসিরকে নিয়মিত অধ্যয়নের মধ্যে থাকা।
দেশ রূপান্তর : মানবজীবনে কোরআন বোঝার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : কোরআন না বোঝার মানে হলো দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও ধারণা না থাকা। কোরআন বোঝা ও কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার বিপুল সওয়াব রয়েছে। মুসলমানদের অনৈক্য, ভুল বোঝাবুঝি ও হানাহানি দূর করে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও হৃদ্যতা আনার বিশুদ্ধ উপকরণই হলো কোরআন মাজিদকে সঠিকভাবে বোঝা ও হৃদয়ঙ্গম করা। কোরআনকে সঠিকভাবে না বোঝাই হলো যত অনৈক্যের মূল। কোরআন শেখা ও তা সঠিকভাবে বোঝা থেকে যারা বিরত থাকে ও মুখ ফিরিয়ে রাখে তারা মূলত কোরআনি জীবনযাপন থেকে সরে গিয়ে অন্য জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষ ইমানহারা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
দেশ রূপান্তর : আপনি তো একজন স্বনামধন্য ওয়ায়েজ। ওয়াজ আসলে কী?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : আরবি ওয়াজ শব্দের বাংলা অর্থ সদুপদেশ। ইসলামি পরিভাষায় ওয়াজ হলো জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে এমনভাবে আহ্বান করা, যাতে তাদের অন্তর বিগলিত হয়। মুমিনের জীবনে ওয়াজ-নসিহত ও উপদেশের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য এসেছে উপদেশ ও তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তার আরোগ্য এবং মুমিনের জন্য হেদায়েত ও রহমত।’ সুরা ইউনুস : ৫৭
পরকালীন লাভ-ক্ষতি উল্লেখ করে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের এই ধারা প্রথম মানব ও নবী হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং পৃথিবীতে যত দিন ইসলামের অস্তিত্ব থাকবে তত দিন তা অব্যাহত থাকবে ইনশা আল্লাহ।
মুসলিম সমাজে ইসলামি শিক্ষার প্রচার-প্রসারে ওয়াজ এখনো প্রাসঙ্গিক। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষ, যারা সব ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান অবলম্বন মসজিদের সাপ্তাহিক নসিহত ও বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল। তারা ওয়াজ মাহফিল থেকে ইসলাম এবং আমলের নানা বিষয়ে শিখে। বলা চলে, ওই শ্রেণির লোকের জন্য ওয়াজ মাহফিলই একটি ভ্রাম্যমাণ মাদ্রাসা।
দেশ রূপান্তর : ওয়াজ শোনার ক্ষেত্রে কোনো বাছ-বিচার করা যাবে কি?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : অবশ্যই ওয়াজ শোনার ক্ষেত্রে বাছ-বিচার করতে হবে। কঠোরভাবে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যার-তার ওয়াজ শোনার অনুমতি ইসলামে নেই। বেশ-ভূষা, সুর, ভাষার প্রাঞ্জলতা আর আধুনিক বিষয়কে নানা যুক্তিতে উপস্থাপন করলেই তাকে ওয়াজের ময়দানে অনুসরণীয় ভাবা যাবে না। বক্তা হওয়ার জন্য জাহেরি-বাতেনি অর্থাৎ ইমান এবং আকিদা উভয়টি সমানভাবে পরিশুদ্ধ হতে হবে। বিজ্ঞ আলেম হওয়া ছাড়া ইমান ও আকিদা পরিশুদ্ধ আদৌ সম্ভব নয়। তাই ওয়ায়েজকে প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানসম্পন্ন, খোদাভীরু, সহিহ আকিদাসম্পন্ন ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। কোরআন-হাদিসের জ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনের জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা। বক্তাকে হাদিসের বিশুদ্ধ ছয় কিতাবসহ অন্যান্য হাদিসের গ্রন্থ সম্পর্কে বিস্তর জানাশোনা থাকতে হবে। সহিহ, যঈফ, মওজু হাদিসের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা থাকতে হবে। এসব ইলমযোগ্য ওস্তাদ থেকে অর্জন করতে হবে এবং কোরআনের তাফসির, কঠিন আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা ইত্যাদি জানতে হবে। দেখুন, আমি ওয়াজের ময়দানে খুব বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ কেউ নই। তার পরও লোকজন আমাকে মহব্বত করেন। কিন্তু আমি যেকোনো বিষয়ে এখনো বড়দের স্মরণাপন্ন হই। আমি মনে করি, ওয়ায়েজদের সর্বদা বড়দের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলা দরকার।
দেশ রূপান্তর : ওয়াজের বিষয় নির্বাচন প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : ওয়াজ যেন দ্বীন ও শরিয়তের বিভিন্ন শাখা থেকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হয়ে থাকে। অপ্রয়োজনীয় ও বেহুদা হাসি-মজাতে যেন সময় নষ্ট না হয়। গ্রহণযোগ্য তাফসির এবং হাদিসের আলোকে ওয়াজ করা। প্রয়োজনে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিজ্ঞ আলেমদের বাণী, সত্য ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলি বলা যেতে পারে। অবশ্যই জাল হাদিস ও অসত্য কাহিনি বর্ণনা করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। ওয়াজের মঞ্চকে নিজের ব্যক্তিগত, দলীয় ও দুনিয়ার কোনো স্বার্থে ব্যবহার না করা। ওয়াজের নামে অন্যের সমালোচনা, আত্মঅহমিকা প্রকাশ না করা। মীমাংসিত মাসয়ালায় ক্ষেত্রে নতুন মত পেশ করে বিভ্রান্তি না ছড়ানো। এক কথায়, বক্তাদের স্থান, কাল, পাত্রভেদে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে ওয়াজ করা। অযথা কৃত্রিমতা, বাচালতা, অতি রসিকতা ও বিকৃত অঙ্গভঙ্গি পরিহার করা। প্রচলিত আইন, সংবিধান, প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের প্রতিপক্ষ না বানানো।
দেশ রূপান্তর : অনেক বক্তা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন না। এ সম্পর্কে নানা অভিযোগ শোনা যায়। আপনি কী মনে করেন?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : প্রথম কথা, যুক্তিসংগত কারণ ও শরয়ি ওজর ছাড়া মাহফিলে না যাওয়া মোটেও উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, আয়োজকরা বক্তার যুক্তিসঙ্গত কারণ, প্রয়োজন, অসুস্থতাকে মানতে চান না। ফলে কেউ সত্যিকারের প্রয়োজনে মাহফিলে যেতে না পারলে তাকে সমালোচনা পাত্র বানানো হয়। নানা অপবাদ দেওয়া হয়, তার নামে মিথ্যা কথা ছড়ানো হয় এগুলো অনুচিত। ওয়াজ ছাড়া একজন বক্তাকে নানাবিধ দায়িত্ব সামাল দিতে হয়, সেগুলো মাথায় রাখা। কারও নামে কিছু বলার আগে যাচাই-বাছাই করে খোঁজখবর নিয়ে তার পর কিছু বলা।
দেশ রূপান্তর : পাঠকদের উদ্দেশে আপনার কিছু বলার আছে কি?
মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : আপনার মাধ্যমে একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ওয়ায়েজ হিসেবে অনেকেই আমাকে ভালোবাসেন, ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে নামের শুরুতে সুলতানুল ওয়ায়েজিন এবং আল্লামাসহ অনেক ভারী ভারী উপাধি ব্যবহার করেন। নানা সময় এটা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছি, অনেককে নিষেধ করেছি। তারপরও এটা বন্ধ হয়নি। আজকে আমি বিনয়ের সঙ্গে আপনার মাধ্যমে অনুরোধ জানাই, কেউ এই উপাধিগুলো আমার নামের শুরুতে আর ব্যবহার করবেন না। ভালো হয়, মাহফিলের পোস্টার-লিফলেট ছাপানোর আগে দেখিয়ে নেওয়া। তাতে মাহফিলের তারিখও যেমন নবায়ন এবং নিশ্চিত হবে, আমিও অযাচিত-অতিরিক্ত উপাধির ভার থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ পাব ইনশা আল্লাহ।
