বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লাবাহী জাহাজ ভিড়ছে আজ

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৩, ০৫:২৭ এএম

ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬৩ হাজার টন কয়লা নিয়ে ‘অউসো মারো’ নামে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ ভিড়ছে মাতারবাড়ীতে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাহাজটি মাতারবাড়ী উপকূলে নোঙর করেছে। আজ মঙ্গলবার এটি জেটিতে ভেড়ার কথা রয়েছে। আর এর মাধ্যমে কয়লাবাহী জাহাজের যাত্রা শুরু হলো মাতারবাড়ীতে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন আতাউল হাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২২৯ মিটার দীর্ঘ ও ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের কোনো জাহাজ এর আগে দেশে ভেড়েনি। আমরা আজ বিকেল ৩টা নাগাদ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জেটিতে ভেড়াব। সেই অনুযায়ী আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি।’ সমুদ্র থেকে ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩৫০ মিটার চওড়া কৃত্রিম চ্যানেলের মধ্য দিয়ে জাহাজটি জেটিতে প্রবেশ করবে।

জাহাজটি ভেড়ার বিষয়ে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ (কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড-সিপিজিসিবিএল) প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে ১১২টি জাহাজ জেটিতে ভিড়লেও সেগুলোতে ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উপকরণ। কিন্তু এবারই প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল কয়লা নিয়ে ভিড়ছে জাহাজ।’ তিনি আরও বলেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬৩ হাজার টন কয়লা নিয়ে জাহাজটি ভেড়ার পর পর্যায়ক্রমে আরও জাহাজ আসবে। পরে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাব। আর সেটা জুনে হতে পারে।

১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ১৬ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩৫০ মিটার চওড়া চ্যানেলের নির্মাণকাজ শেষ। এই চ্যানেলের পাশেই গড়ে উঠবে আগামীর গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি। এখন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে জাহাজ ভিড়ছে। আগামী জুনে গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মাতারবাড়ীতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাহাজ ভিড়ছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২২৯ মিটার দীর্ঘ ও ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট’র (জাহাজের পানির নিচের গভীরতা) পানামার পতাকাবাহী এমভি ‘অউসো মারো’ মাতারবাড়ীতে ভিড়বে। এটি অবশ্যই চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এর আগে দেশে এত বড় দৈর্ঘ্যরে ও গভীরতার জাহাজ ভেড়েনি।’ চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে এখন সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফট ও ২০০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ ভেড়ার সুযোগ আছে। পায়রাবন্দরেও চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ভিড়েছে ১০ দশমিক ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ। কিন্তু ‘অউসো মারো’র মতো দীর্ঘ ও ড্রাফটের জাহাজ এটাই প্রথম।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) অধীনে জাপানের তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি স্টিম টারবাইন, সার্কুলেটিং কুলিং ওয়াটার স্টেশন স্থাপন, ২৭৫ মিটার উচ্চতার চিমনি ও পানি শোধন ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি টাউনশিপ নির্মাণ, গ্রাম বিদ্যুতায়ন এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন কাজের আওতায় চকরিয়া-মাতারবাড়ী ১৩২ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ ও ১৩২/৩৩ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও অ্যাশ ডিসপোজাল এরিয়া এবং বাফার জোন নির্মাণ করা হবে।

এদিকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে দুটো অংশ রয়েছে। একটি অংশ হলো বন্দর নির্মাণ এবং অপর অংশটি সড়ক ও জনপথের আওতাধীন রাস্তা নির্মাণ। ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পে বন্দর অংশে রয়েছে ৮ হাজার ৯৫৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং সড়ক ও জনপথ অংশে রয়েছে ৮ হাজার ৮২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি মাল্টিপারপাস জেটি এবং ৪৬০ মিটার দীর্ঘ একটি কনটেইনার জেটি নির্মিত হবে। চ্যানেলের (জাহাজ চলাচলের পথ) চওড়া ৩৫০ মিটার এবং গভীরতা ১৬ মিটার। জেটি নির্মাণ কাজ শেষ করতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। সে বছর ১১ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন্দর।

২০১৫ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নেয় সরকার। জাইকার অর্থায়নে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৬ মিটার ড্রাফট (গভীরতা) এবং ২৫০ মিটার চওড়া চ্যানেল নির্মাণ হয় বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায়। কয়লা বিদ্যুতের চ্যানেলের ওপর ভিত্তি করে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা যায় বলে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) একটি প্রস্তাবনা দেয়। সেই প্রস্তাবনা ও পরবর্তী সময়ে সমীক্ষার পর ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। আর এরই আওতায় চ্যানেলের চওড়া ১০০ মিটার বাড়ানোর পাশাপাশি গভীরতাও ১৮ মিটারে উন্নীত করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত