জ্বালানি আমদানিতে একধাপ অগ্রগতি

আপডেট : ০৩ মে ২০২৩, ০৫:৩৭ এএম

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ব্যাচের পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) উৎপাদন প্রস্তুতি সনদসংক্রান্ত চুক্তি সই হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে এ চুক্তি সইয়ের পরই শুরু হবে জ্বালানি উৎপাদন, যা আগামী অক্টোবরে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এটা দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে হবে আরেকটি মাইলফলক।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরেনিয়াম আমদানি ও সংরক্ষণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার ক্লাবে যুক্ত হবে। এ মর্যাদা পাওয়ার পাশাপাশি বিশে^র দরবারে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করবে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে উৎপাদন শুরু করতে আর কোনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও থাকবে না।

গত সোমবার রাতে প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শৌকত আকবরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। তারা সেখানে রোসাটমের পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির কেন্দ্র পরিদর্শন করবে। এরপর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি উৎপাদন প্রস্তুতি সনদসংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হবে দুই দেশের মধ্যে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা মেনেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ও  রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর।

সূত্রমতে, স্পর্শকাতর এ জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য আইএইএর অনুমোদন ও লাইসেন্সের পাশাপাশি রাশান ফেডারেশনের রপ্তানি নীতির আলোকে তাদের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জ্বালানি আমদানি করে তা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো হবে। এজন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ সম্পৃক্ত থাকবে আরও অনেক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে গোয়েন্দা তৎপরতা থাকবে।

পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে এককভাবে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো এটি। রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের জেনারেল ডিজাইনার ও কন্ট্রাক্টর রাশিয়ার রোসাটম করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা।

এ বিদ্যুৎ প্রকল্পের দুটি ইউনিটে থাকছে ৩+ প্রজন্মের রুশ ভিভিইআর রিঅ্যাক্টর, যেগুলো সব আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে সক্ষম। বাণিজ্যিকভাবে এ কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ চার ভাগের তিন ভাগ শেষ হয়েছে। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৪ সালে এবং এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড যোগ হওয়ার কথা রয়েছে।

২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বরে উদ্বোধনের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে চলছে এর নির্মাণকাজ। করোনা মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কারণে কাজ শেষ হতে কিছুটা দেরি হলেও এর ব্যয় বাড়বে না বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি রাশিয়া থেকে দেশে এসে পৌঁছেছে। কিছু যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়াধীন। আগামী জুনের মধ্যে আনুষঙ্গিক সব পূর্ত কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি সংস্থাপন শেষে এখন চলছে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি।

প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পে রাশিয়া ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ ২৭ হাজার টাকা।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার লেনদেন এবং যন্ত্রপাতি আমদানি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রকমের নিষেধাজ্ঞায় বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অবশ্য সম্প্রতি রাশিয়ার দেওয়া ঋণ পরিশোধে যে জটিলতা ছিল তা কেটে গেছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে ঋণের অর্থ ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রায় পরিশোধে একমত হয়েছে ঢাকা-মস্কো।

মস্কোকে আরও চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে গত ১২ এপ্রিল রাশিয়ার ৮০ প্রতিষ্ঠান ও একক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রোসাটমের সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এবং রোসাটম ওভারসিসের প্রেসিডেন্ট ইভজেনি পাকেরমানভের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে ওই তালিকায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম নেই।

এর আগে এক রুশ জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু সরঞ্জাম পেতে প্রায় তিন মাস দেরি হয়েছে। এখন নতুন করে ওয়াশিংটনের ওই নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশের প্রথম এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ যথাসময়ে শেষ হওয়া নিয়ে অনেকে সংশয় পোষণ করলেও রোসাটমের দাবি, এতে প্রকল্পের কাজে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটবে না।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞাকে রাশিয়া তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। যেকোনো মূল্যে তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ করবে। তাদের জন্য মর্যাদার লড়াই হওয়ায় এ প্রকল্পকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত