শহরের বাইরে ট্যাক্স হলিডের প্রস্তাব

আপডেট : ০৪ মে ২০২৩, ০৬:০৬ এএম

শহর এলাকার বাইরে পরিকল্পিত ও টেকসই আবাসন গড়ে তুলতে চান বেসরকারি আবাসন শিল্পের উদ্যোক্তারা। এজন্য আসন্ন বাজেটে সরকারের কাছে ১০ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’র প্রস্তাব করেছেন তারা। সরকার প্রস্তাব গ্রহণ করলে আগামী অর্থবছর থেকে শহর এলাকার বাইরেও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেখছেন বেসরকারি আবাসন শিল্পের উদ্যোক্তারা।

তাদের মতে, দেশের শহরাঞ্চলে মানুষের বাস ধারণ-ক্ষমতার চেয়ে বেশি। ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নেই। অধিকাংশ মানুষ যেনতেনভাবে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। অল্প জায়গায় বেশি মানুষের বসবাসের কারণে নিম্নবিত্তরা শহরে বাসযোগ্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। শহরের বাইরে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আবাসন গড়ে তোলা হলে স্বল্প খরচে মানুষ সেখানে নিজেদের জন্য আবাসন খুঁজে নিতে পারবেন। পাশাপাশি শহরমুখী মানুষের চাপ কমবে।

বেসরকারি আবাসন খাত-সংশ্লিষ্টদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। এর পক্ষ থেকে আসন্ন ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটে ৯টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একটি প্রস্তাবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাইরে নগরায়ণকে উৎসাহিত করতে ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধা চাওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে জেলা শহরে শিল্প স্থাপনের জন্য কয়েকটি শিল্প খাতে ট্যাক্স হলিডে’র সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবাসন খাতে ট্যাক্স হলিডে’র সুযোগ সৃষ্টি করলে রাজধানী শহর, বিভাগীয় শহর ও পৌরসভা এলাকার বাইরে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিকল্পিত আবাসন গড়ার কাজ প্রসার লাভ করবে। এতে বড় শহরগুলোর ওপর মানুষের চাপ কমবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিহ্যাবের আসন্ন বাজেট প্রস্তাবে মানুষের জন্য আবাসনপ্রাপ্তি সহজ করতে শহর এলাকায় নিম্নবিত্তদের জন্য আবাসন গড়তে ৫ বছরের ট্যাক্স হলিডের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা জেলাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটান এলাকা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের ভাইস-প্রেসিডেন্ট (ফাইন্যান্স) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবাসন শিল্পের প্রসার এবং সবার জন্য বাসযোগ্য আবাসনের চিন্তা থেকে রিহ্যাব এমন প্রস্তাব করেছে। মানুষ এখন রাজধানী ও বিভাগীয় শহরমুখী। ধারণ-ক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ শহরে বসবাস করায় তারা ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকার নীতি-সহায়তা দিলে ব্যবসায়ীরা শহর এলাকার বাইরে আবাসন গড়তে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। সরকারের দায়িত্ব দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশেষ নির্দেশনা ও সুবিধা দেওয়া।’ 

তিনি বলেন, ‘মহানগর এলাকায় নিম্নবিত্ত মানুষের আবাসন সুবিধার জন্য ৫ বছরের ট্যাক্স হলিডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করলে আবাসন শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি নিম্নবিত্ত মানুষ আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারবেন। আমাদের এসব প্রস্তাব আসন্ন বাজেটে সরকার বিবেচনায় রাখছে কিনা, সে বিষয়ে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’ 

জানতে চাইলে নগরপরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অংশীদারত্বমূলক ভবন তৈরিতে রিহ্যাব সদস্যরা বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন। তারা শুধু ঢাকা-কেন্দ্রিক উন্নয়ন কাজ করছেন। তাদের ঢাকার বাইরেও যেতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এবারের বাজেট প্রস্তাবে রিহ্যাব নগরের বাইরে আবাসন গড়ার জন্য ট্যাক্স হলিডে দাবি করেছে শুনে ভালো লাগছে। আবাসন খাতের অভিজ্ঞ এই শ্রেণিকে ঢাকার বাইরে অন্যান্য এলাকায়ও যেতে হবে। আর এ কাজটি সহজ করতে সরকারকে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। সব দেশেই এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের জন্য ৫ বছরের ট্যাক্স হলিডে চেয়েছে রিহ্যাব। প্রস্তাবটি ভালো। সরকার প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি-সহায়তা দিলে তা আবাসন খাতের জন্য ভালো হবে।’ 

স্থপতি ও নগর-বিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিহ্যাবের প্রস্তাব ভালো। সরকারকে সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে জনস্বার্থে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। দরিদ্র মানুষ যেন এ সুবিধা পান তা নিশ্চিত করতে হবে।’ 

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) চেয়ারম্যান মো. মুনিম হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবাসন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকা, অন্যান্য বড় শহরের বাইরে যেতে হবে। তাহলে বড় শহরগুলোর ওপর মানুষের চাপ কমবে। রিহ্যাব আসন্ন বাজেটে সরকারের কাছে যে প্রস্তাব করেছে, সেটা ইতিবাচক। সরকার এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেবে।’ 

রিহ্যাবের অন্যান্য দাবি : দেশের আবাসন খাতকে টিকিয়ে রাখতে এবং সহজে মানুষের মৌলিক চাহিদা আবাসন নিশ্চিত করতে আসন্ন বাজেটে সরকারের কাছে ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে রিহ্যাব। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ, ফ্ল্যাট ও প্লটের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কর ও ফি সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশ করা, দ্বিতীয়বার প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন কর ও ফি সর্বোচ্চ ৩ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করা, গৃহায়ন শিল্প-উদ্যোক্তাদের আয়কর কমানো, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অনুযায়ী জমির মালিকের জন্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৪ শতাংশ করা, রাজউক ও সিডিএর আওতাভুক্ত এবং তার বাইরের এলাকায় সব জমির ক্ষেত্রে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারায় আরোপিত কর প্রত্যাহার, সাপ্লায়ার ভ্যাট ও উৎসে কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে ৫ বছরের জন্য ডেভেলপারদের অব্যাহতি এবং নগর এলাকায় বাইরে আবাসন ও নিম্নবিত্ত মানুষের আবাসনের জন্য নির্ধারিত সময়ের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়া।’    

রিহ্যাবের ভাইস-প্রেসিডেন্ট (ফাইন্যান্স) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কভিড-১৯-এর ধাক্কার পর আবাসন খাত এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। কিছুদিন ভালো তো কিছুদিন মন্দ, এভাবে চলছে। এর মধ্যে নির্মাণ সামগ্রীর ঊর্ধ্বমুখী মূল্য বড় আঘাত হিসেবে এসেছে। এ শিল্পের সংকট উত্তরণের জন্য আসন্ন বাজেটে ৯ দফা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করলে সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত