নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্টিল কারখানায় লোহা গলানোর সময় চুল্লি বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ আরও তিন শ্রমিক মারা গেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তাদের মৃত্যু হয়। তারা সবাই রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এ নিয়ে বিস্ফোরণের ওই ঘটনায় চার শ্রমিকের মৃত্যু হলো। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি রয়েছেন আরও তিনজন।
এদিকে রূপগঞ্জের ভুলতার শাওঘাট এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটা আরআইসিএল (রহিম ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেড) স্টিল মিলে অভিযান চালিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলের ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন রূপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল হক। এ ছাড়া বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রূপগঞ্জের বিস্ফোরণে সবশেষ মারা যাওয়া তিনজন হলেন আলমগীর হোসেন (৩০), নিয়ন শেখ (২০) ও ইলিয়াস আলী (৩৫)। এর মধ্যে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় মারা যান নিয়ন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আলমগীর এবং গত বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান ইলিয়াস। বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, আলমগীরের শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ ছিল। আর নিয়নের ৯৫ ও ইলিয়াসের ৯৮ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তাদের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। বিস্ফোরণের এ ঘটনায় আরও তিনজন ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে মো. জুয়েলের (২৫) শরীরের ৯৭, গোলাম রব্বানি রাব্বির (৩৫) ৯৫ ও ইব্রাহিমের (৩৫) ২৮ শতাংশ দগ্ধ রয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়।
গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে রূপগঞ্জের গাউছিয়া শাওঘাট এলাকার আরআইসিএল স্টিল মিলে লোহা গলানোর চুল্লিতে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে গলিত তরল লোহা শ্রমিকদের ওপর ছিটকে পড়লে গুরুতর দগ্ধ হন সাতজন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান শংকর (৪০) নামে একজন।
সবশেষ মারা যাওয়াদের মধ্যে আলমগীরের বাড়ি হবিগঞ্জের আজমেরীগঞ্জ উপজেলার জলশুকা গ্রামে। বাবার নাম আজাদ আলী। ওয়ার্ডের ভেতরে বিছানায় তার নিথর দেহটি পড়ে ছিল। আলমগীর আর বেঁচে নেই শুনে ছোটাছুটি করতে থাকেন তার পাগলপ্রায় মা, বাবা আর স্ত্রী নিপা আক্তার। তাদের সামাল দিতে বেগ পেতে হয় পরিবারটির অন্য সদস্যদের। তাদের চিৎকার হাসপাতালের ৫ম তলায় জানান দিচ্ছিল আপনজন হারানোর বার্তা।
আহাজারিতে শামিল হওয়া আলমগীরের নানি আনিকা বেগম জানান, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শাহীবাজার এলাকায় স্ত্রী নিপাসহ পরিবার নিয়ে থাকতেন আলমগীর। অনেক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্টিল মিলে কাজ করে আসছিলেন। দুই মাস আগে রূপগঞ্জের ওই স্টিল মিলে কাজ শুরু করেন তিনি।
মামা মো. নাসির উদ্দিন জানান, নিয়নের বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামে। বাবার নাম আহমদ আলী। রূপগঞ্জের ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় থাকতেন। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ছিলেন।
নিহত ইলিয়াসের বড় ভাই মো. আল-আমিন হোসেন জানান, তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনায়। স্ত্রী স্বর্ণা আক্তার, এক মেয়েসহ পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পাগলা মধ্য রসুলপুরে থাকতেন ইলিয়াস।
কারখানার গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন : আরআইসিএল স্টিল মিলের গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমানকে। এ ছাড়া কাঞ্চন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো. রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব এবং নারায়ণগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২-এর প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
রূপগঞ্জের ইউএনও ফয়সাল হক বলেন, ‘মিল কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছি। ঘটনার তিন ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন বা ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করেনি মিল কর্র্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগ পর্যন্ত এবং সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার কয়েকজন শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, মাস তিনেক আগে কারখানাটি চালু করা হয়েছে। কারখানায় প্রাথমিকভাবে ২০-২৫ জন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে কারখানার ভেতরে কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপণসামগ্রী রাখা হয়নি। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার জন্য শ্রমিকদের দেওয়া হয়নি কোনো সুরক্ষা সামগ্রী। তারা ঝুঁকি নিয়ে কারখানাটিতে কাজ করছিলেন। শ্রমিকরা মালিকপক্ষকে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়ার কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু মালিকপক্ষ তাদের কথায় কর্ণপাত না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে যাচ্ছিল।
রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এফ এম সায়েদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা বা অভিযোগ জমা পড়েনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে মামলা বা অভিযোগ না দিলে এ ঘটনায় দোষীদের আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’
