গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলি বা পদায়নে শৃঙ্খলা আনতে নীতিমালা প্রণয়ন করছে মন্ত্রণালয়। এতে প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে গ্রেড-৫ বা নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলির ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এটা কার্যকর হলে মাঠপর্যায়ের কাজের সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণে বড় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, গণপূর্তের বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম রয়েছে এটা সত্য। এজন্য মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা খুবই প্রশংসার দাবি রাখে। যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে তা করা হলে সরকারের বিশেষায়িত এ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরও দক্ষ হয়ে উঠবে। এখন যারা নানা ভালো জায়গায় বদলি বা পদায়নের সুযোগ পাচ্ছেন না তারাও সে সুযোগ পাবেন। তবে ওই নীতিমালা করে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলির ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া কোনো বিবেচনায় সঠিক হবে না। মন্ত্রণালয়ের খসড়া নীতিমালায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে সেখান থেকে সরে এসে আগের অবস্থায় রাখতে হবে।
জানা যায়, গত ২০ ডিসেম্বর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-১ থেকে জারিকৃত অফিস আদেশে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সব বদলি বা পদায়নের ক্ষমতা স্থগিত করা হয়। ওই আদেশে বলা হয়, সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা হয়রানিমূলক বদলিসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়গুলো বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সমন্বয়হীনভাবে বদলি করায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। সেই থেকে বদলি বা পদায়ন বন্ধ ঝুলে রয়েছে। তবে এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গুটিকয়েক বদলি বা পদায়ন করেছে অধিদপ্তর।
আরও জানা যায়, সরকারি চাকরি আইনের ১১ নম্বর ধারা এবং রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬-এর রুলস ৪(৯)(এ) এর ক্ষমতাবলে সরকার গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মচারীদের সুষ্ঠুভাবে পদায়নের লক্ষ্যে এ নীতিমালা প্রণয়ন করছে। এ নীতিমালার ‘গণপূর্ত অধিপ্তরের কর্মচারীদের বদলি বা পদায়ন নীতিমালা-২০২৩’ নামে অভিহিত হবে। এ নীতিমালায় ৬টি ধারা এবং ২০টি উপধারা রাখা হয়েছে। এ নীতিমালার ৪-এর ১ উপধারা নিয়ে আপত্তি উঠেছে। সেখানে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের গ্রেড-৫ ও তদূর্ধ্ব পদে বদলি বা পদায়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত থাকবে। অন্য গ্রেডেরগুলো গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত থাকবে।
এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এজন্য মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরে প্রধান প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়নের ক্ষমতা স্থগিত করে। এর উদ্দেশ্য ছিল একটি নীতিমালা করে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খলা না হয়।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় গণপূর্তের বদলি বা পদায়নবিষয়ক একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সেখানে গ্রেড-৫ পর্যন্ত ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে রাখা হয়েছে। ইতিপূর্বে গ্রেড-৫ পর্যন্ত বদলির যে চর্চা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী করেছেন; তার স্বপক্ষে তারা লিখিত কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে পারেনি। সার্বিক চিন্তা করেই নীতিমালা চূড়ান্ত করবে মন্ত্রণালয়। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ওই সংস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো।
জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রকৌশলী ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ ভূইঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৮৬ সালে ‘মার্শাল ল’ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। সেই থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বদলি বা পদায়নের এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়। যদিও এর আগে থেকেও এমন চর্চা ছিল অধিদপ্তরের। তিনি বলেন, গ্রেড-৫ বা নির্বাহী প্রকৌশলী পদটি মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাদের বদলি বা পদায়নের ক্ষমতা প্রধান প্রকৌশলীর হাতে না থাকলে তিনি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। এতে কাজের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এ ধরনের বিষয় রেখে নীতিমালা চূড়ান্ত হলে গণপূর্ত অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণপূর্তে গ্রেড-৫ বা নির্বাহী প্রকৌশলীরা মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ওই সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী ভালো জানেন, কাকে কোথায় রাখলে কাজ ভালো হবে। এজন্য এ ক্ষমতা প্রধান প্রকৌশলীর হাতে থাকা যুক্তিযুক্ত। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় নীতিমালা করে প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলীর ক্ষমতা কেড়ে নিলে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করতে খুব অসুবিধা হবে। মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।
নীতিমালায় আরও যা থাকছে : নীতিমালার প্রথম ধারা শিরোনাম ও প্রয়োগ। এখানে ক-তে বলা হয়েছে, এ নীতিমালা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মচারীগণের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৩ নামে অভিহিত হবে। এ ধারার খ-তে বলা হয়েছে, এই নীতিমালা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১০ গ্রেড এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মচারীদের বদলি/পদায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। গ-তে বলা হয়েছে, এই নীতিমালা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ধারা-২-এ নীতিমালার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ধারা-৩-এ বলা হয়েছে, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডার এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১০ গ্রেডের নন-ক্যাডার কর্মচারীদের বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ৩-এর ১-এ বলা হয়েছে, কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা, সততা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিগত বছরের চাকরির বৃত্তান্ত বিবেচনায় পদায়ন করা হবে। ৩-এর ২-এ বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ের পদায়নের ক্ষেত্রে একই জেলায় একই পদে স্বল্পবিরতিতে দুই মেয়াদে পদায়ন করা যাবে না। তবে বিশেষায়িত পদসমূহে অর্থাৎ প্রকল্প প্রণয়ন, কাঠামোগত, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং নকশা প্রণয়ন, পিঅ্যান্ডডিসহ বিভিন্ন নকশা প্রণয়নে কর্মরতদের ক্ষেত্রে পদায়নের মেয়াদ শিথিলযোগ্য। ৩-এর ৩-এ বলা হয়েছে, বিভাগীয় শহর ছাড়া কোনো কর্মচারীকে নিজ জেলায় পদায়ন করা যাবে না। ৩-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক করা যাবে না। ৩-এর ৫-এ বলা হয়েছে, পার্বত্য বা দুর্গম এলাকায় কর্মচারীর চাকরিকালীন সময় হবে সর্বোচ্চ দুই বছর। তবে চাকরির জীবনে এটা চার বছরের বেশি হবে না। ৩-এর ৬-এ বলা হয়েছে, একই কর্মস্থলে দুই বছর হলে ওই কর্মচারী বদলিযোগ্য হবেন। আর একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় রাখা যাবে না। ৩-এর ৭-এ বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর স্ত্রী বা স্বামী উভয়ে চাকরিজীবী হলে একই কর্মস্থলে বা যথাসম্ভব নিকটবর্তী কর্মস্থলে পদায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।
৫-এর ক-তে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের জোন, সার্কেল, বিভাগ ও উপবিভাগসমূহকে কাজের পরিধি, প্রকৃতি, গুরুত্ব, রাজধানী, বিভাগ, জেলা শহর থেকে দূরত্ব বিবেচনায় তিনটি শ্রেণিতে অর্থাৎ-ক, খ ও গ শ্রেণিতে বিন্যাস্ত করা হবে।
সবশেষ ধারা-৬-এর ১-এ বলা হয়েছে, এ নীতিমালার কোনো অনুচ্ছেদের বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা পরিলক্ষিত হলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
