কারসাজির ‘সম্রাট’ হুমায়ুন

আপডেট : ১০ মে ২০২৩, ০৫:৫৬ এএম

শরীয়তপুরের জাজিরার বিকেনগর ইউনিয়নের হাওলাদারকান্দি গ্রামের প্রয়াত আবদুল হক ঢালীর ছেলে হুমায়ুন ঢালী। পাঁচ বছর আগেও জাজিরা উপজেলার কাজিরহাটসহ কয়েকটি হাটে ছাগল বিক্রির দালালির পাশাপাশি অন্যের জমিতে ট্রাক্টর চালিয়ে করতেন হালচাষ। দরিদ্র পরিবার ও দিনমজুরের সন্তান এই হুমায়ুনের একসময় নিজের ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমি ছিল না। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই তিনিই এখন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। নিজের নামে কিনেছেন কয়েক কোটি টাকার জমিও। মাত্র কয়েক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া এই হুমায়ুন এখন মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছেন।

পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কারসাজি করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মাদারীপুর জেলা প্রশাসন থেকে ২০ জন দালালের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যাতে রয়েছে আলোচিত এই হুমায়ুন ঢালীর নামও। এই দালালদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য তালিকাটি ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

নাওডোবা-জাজিরা আঞ্চলিক সড়কঘেঁষে বিকেনগর ইউনিয়নের দৈনিক বাজার এলাকায় হুমায়ুন ঢালীর বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচতলা একটি বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে। ইতিমধ্যে দোতলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই বাড়িটি কিছুদিন আগেও ছিল একতলা। কিন্তু নাওডোবা-জাজিরা আঞ্চলিক সড়ক চার লেনে উন্নীতের কাজ শুরু হবে জানার পর বাড়িটি বর্ধনের কাজ শুরু হয়। যাতে জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়া অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ অতিরিক্ত টাকা উত্তোলনের জন্য হুমায়ুন ঢালীর বাড়ির চত্বরে টিনের আরও ৫টি চৌচালা ঘর তোলা হয়েছে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতুর জাজিরা পয়েন্টের নাওডোবা গোলচত্বর থেকে শরীয়তপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিনটি প্যাকেজে ২৭ কিলোমিটার সড়ক চার লেন, ২৭টি কালভার্ট ও ২টি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছ। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ২৩১ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে জমি অধিগ্রহণে। আর এই ক্ষতিপূরণের টাকা দিচ্ছে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে। নাওডোবা থেকে শরীয়তপুর পর্যন্ত সড়ক চার লেন করার প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই দুই পাশে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। ডিসি অফিসের এলএ শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী দালাল চক্র। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, সড়ক প্রশস্ত করতে উভয় পাশেই জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে বেশি অর্থ হাতিয়ে নিতে এসব স্থাপনা নির্মাণ করছে দালাল চক্র। এজন্য রাতারাতি তোলা হচ্ছে ঘর। লাগানো হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির চারা গাছ। নির্মাণ করা হচ্ছে কারখানা ও খামার। সড়কের উভয় পাশেই দেখা গেছে নির্মাণাধীন পাকা, আধা পাকা ও টিনশেডের বসতঘর, দোকান, করাতকল, মাছ, মুরগি ও গরুর খামার।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেনগর এলাকার চান মিয়া শেখের কাছ থেকে ২২ শতাংশ জমি কেনেন তালিকাভুক্ত দালাল হুমায়ুন ঢালী। যার দলিল নম্বর ৮০১/২০। একই বছরের ৯ জুন একই এলাকার জলিল শিকদারের কাছ থেকে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ জমি কেনেন তিনি। যার দলিল নম্বর ১২৮৭/২০। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি একই এলাকার দানেছ শেখের কাছ থেকে ২১ শতাংশ জমি কেনেন হুমায়ুন ঢালী। যার দলিল নম্বর ৬৬৩/২০। তার আগের বছর ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট একই এলাকার আবদুল জলিল শিকদারের কাছ থেকে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ জমি কেনেন তিনি। যার দলিল নম্বর ৩১২৩/১৯।

হুমায়ুন ঢালীর কাছে জমি বিক্রি করা জাকির শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দেড়-দুই বছর আগে দুটি জমি হুমায়ুন ঢালীর কাছে বিক্রি করেছি। জমির পরিমাণ একটা ৪ কাঠা, অন্যটি ৫ কাঠা। একটি ২৩ লাখ টাকা, অন্যটি ৫ লাখ টাকা। হঠাৎ শুনি হুমায়ুন ঢালী অনেক জমি কিনতেছে। তখন তার কাছে জমি বিক্রি করছি। শুনছি ব্রিজের ওখান থেকে (পদ্মা সেতু) টাকা কামাই করছে। মানুষের বিল নাকি কি করে নিয়ে গেছে। কেমনে কী করছে তা জানি না।’

হুমায়ুন ঢালীর কাছে জমি বিক্রি করা আরেকজন ইদ্রিস হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আমি ৭ শতাংশ ও আমার চাচা ২০ শতাংশ জমি হুমায়ুন ঢালীর কাছে বিক্রি করছে। ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা করে শতাংশ দাম দিছে। হুমায়ুন ঢালী আগে সংসারী কাজ করত। কোথায় এত টাকা পেল তা জানি না।’

বিকেনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজি ইস্কান্দার আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। এক বছর আগে দেশে এসে নির্বাচন করে চেয়ারম্যান হয়েছি। হুমায়ুন ঢালীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। পাঁচ বছর আগেও নিম্ন ফ্যামিলির ছিল তারা। এখন অর্থবিত্ত ও প্রভাবশালী হয়েছে। তবে কীভাবে এত টাকাপয়সা, অর্থবিত্ত হলো, কী ব্যবসা করে, তা আমার জানা নেই। আমি জানি ৫-৭ বছর আগে এমনই কৃষিকাজ করত। বর্তমানে আমাদের সঙ্গে রাজনীতিতে জড়িত সে। তাকে কোনো পদ দেওয়া নেই। নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা নেই তার। এখন আবার দুবাই যাওয়া-আসা করে।’

প্রতিবেশী খোকন হাওলাদার বলেন, ‘হুমায়ুন ঢালী আমার পরিচিত, আমাদের পাশেই বাড়ি। ছোট থেকে একত্রেই বড় হয়েছি। ওরে ৪ বছর আগেও মেশিন (পাওয়ার টিলার) চালাইতে, কৃষিকাজ করতে দেখেছি। কাজীরহাটে বকরি-ছাগলের দালালি করতে দেখেছি। হঠাৎ করেই দেখি ও অনেক জমিজমা কিনেছে। অনেক বড় বিল্ডিং করছে। কদিন আগে টিভিতে দেখেছি মাদারীপুরের ডিসি তার নামে দুদকে একটা মামলা দিয়েছে।’

হুমায়ুন ঢালীর মেয়ে ফাতেমা আক্তারের (১৯) কাছে তার বাবার অর্থ-সম্পদের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা দুবাইয়ে অন্যরকমের ব্যবসা করেন। যেমন : সাবান, শ্যাম্পু, কসমেটিকসের ব্যবসা করেন।’

হুমায়ুন ঢালীর মা জমিলা খাতুন বলেন, ‘হুমায়ুন আগে মেশিন (পাওয়ার টিলার) চালাইছে, ধান-পান ভাঙাইছে। আমার বাবার বাড়ির জায়গা-জমির টাকাপয়সা পাইছি ২০ লাখ। অন্য ছেলেদেরসহ হুমায়ুনকে সেই টাকার ভাগ দিয়েছি।’

সার্বিক বিষয়ে হুমায়ুন ঢালীর বক্তব্য নিতে তার বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। তার সঙ্গে দেখাও হয়। কিন্তু পরিচয় গোপন করে বাড়ি থেকে কৌশলে সটকে পড়েন। পরে মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি বিভিন্ন ব্যস্ততা দেখিয়ে বলেন, ‘আমি বিদেশে ছিলাম, বর্তমানে দুবাই থেকে এনে কসমেটিকসের ব্যবসা করি। ব্যবসার লাইসেন্স নেই, তবে এয়ারপোর্টে ট্যাক্স দিই। আমার নানার বাড়ির ৫০ বিঘা জমি বিক্রির টাকা পাইছি। আর বাবার দেড় কোটি টাকার জমি বিক্রি করেছি, আমরা চার ভাই। আমি কোনো জমি কিনি নাই।’

নিজের নির্মাণাধীন অট্টালিকাসম বাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি আমার বাবা করে রেখে গেছেন। আমার বাবা মারা গেছেন সাত বছর আগে। বাবা কৃষক ছিলেন। আপনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বইলেন, এগুলো (হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া) সব মিথ্যা কথা।’ এসব কথা বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন হুমায়ুন।

হুমায়ুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ করার সুযোগ নেই। দালালদের তালিকা পেলে প্রয়োজনে আমাদের অফিসে টাঙিয়ে রাখা হবে। কেউ যাতে অনৈতিক সুবিধা না নিতে পারে তার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

এ বিষয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি নয়, আমরা সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। আমরা তদন্তপূর্বক সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত