যেভাবে মেসিদের নীল আকাশে বিকাশ

আপডেট : ১১ মে ২০২৩, ০৪:৫৪ এএম

বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের আকাশি-নীল জার্সির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। গত ৮ মে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এবং বিকাশ যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে জানায় এএফএর স্থানীয় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিকাশের অন্তর্ভুক্তির কথা। এ ব্যাপারে বিকাশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ চুক্তির হাত ধরে আগামীতে অনেকভাবেই আর্জেন্টিনা ফুটবল দল বাংলাদেশে তাদের ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।

২০২২ বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ভক্তদের ভালোবাসার স্রোত পৌঁছে যায় বুয়েনস আয়ার্সেও। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আকাশি-নীল ভক্তদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা মোহিত করেছে আর্জেন্টাইনদেরও। সেখান থেকে সাংবাদিকরা বাংলাদেশে এসেছেন লিওনেল মেসির ভক্তকুলদের উন্মাদনার খবর জানতে। পুনঃস্থাপিত হয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও। বহু বছর পর ঢাকায় ফের চালু হয়েছে আর্জেন্টিনার দূতাবাস। আর্জেন্টিনার বিজয় উৎসবে দেখা গেছে বাংলাদেশের পতাকা, সাক্ষাৎকারে মেসিও বলেছেন তিনি শুনেছেন বাংলাদেশের মানুষের তাকে ঘিরে উন্মাদনার কথা। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের এ অভাবনীয় ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করেই ফুটবল ভক্তদের সঙ্গে আরও যোগাযোগ বাড়ানোর উপায় খুঁজছিল এএফএ। সবদিক বিচার করে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বেছে নেয় বিকাশকে।

২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা বিকাশ বর্তমানে দেশের শীর্ষ মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন এক কোটির বেশি মানুষ বিকাশ ব্যবহার করে লেনদেন করছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সেরা ব্র্যান্ডের পুরস্কার পেয়ে আসছে বিকাশ। তাই তো আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বেছে নিয়েছে বিকাশকে, জানাচ্ছিলেন বিকাশের এক কর্মকর্তা, ‘আসলে আমাদের সঙ্গে এএফএ যোগাযোগ শুরু করে প্রায় পাঁচ মাস আগে, বিশ্বকাপের পরপরই। বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা, অকুণ্ঠ সমর্থন এ সবকিছুই খেয়াল করেছে তারা। এ ভালোবাসাটা জিইয়ে রাখতে এবং দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করতেই আমাদের এ অংশীদারত্ব’। তিনি জানালেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ফিফা এ অংশীদারত্বের আগে অনেক কিছু যাচাই-বাছাই করেছে। বিকাশের অংশীদারত্বে আছে ব্র্যাক ব্যাংক, জাপানের সফট ব্যাংক, চীনের আলিবাবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান অ্যান্ট গ্রুপ, বিশ্বব্যাংক এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে বিকাশের এ সংযুক্তিগুলোও একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা গেছে।

আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের রিজিওনাল স্পন্সর বা আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় আছে ভারতের টাটা এবং আমুল, চীনের ওয়ান্ডা, মধ্যপ্রাচ্যের মাশরেক ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের লোগো শোভা পাচ্ছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে, যেখানে এখন যুক্ত হয়েছে বিকাশও।

আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জার্সিতে দেখা যায় কোকা-কোলা, অ্যাডিডাসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর লোগো। বিকাশের লোগো আকাশি-নীলদের জার্সিতে দেখা যাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিকাশের ওই কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘সেগুলো আরও বড় ব্যাপার। এখনই আমাদের লোগো ওদের জার্সিতে যাবে না।’ তাহলে আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বিকাশ কীভাবে উপকৃত হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে এক বছরের চুক্তি হয়েছে যেটা নবায়নযোগ্য। এই এক বছরে আমাদের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অনেক রকম কার্যক্রমই হবে। আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকাশের ব্যবহারকারীদের জন্য শুভেচ্ছাবার্তা দেবেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলবেন। তবে সবচেয়ে বড় যে সুযোগ আমরা এ অংশীদারত্বে দেখছি তা হচ্ছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে মোবাইলে মুঠোফোন সেবা প্রদানকারী চ্যাম্পিয়ন দলের যোগসূত্র স্থাপন হয়েছে।’

আগামী এক বছরে বিকাশ গ্রাহকদের জন্য অনেকরকম চমকই অপেক্ষা করছে। আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলোয়াড়দের সই করা জার্সি, পোস্টার, নানান রকম মার্চেন্ডাইজ জেতার সুযোগ আসতে পারে বিকাশ ব্যবহারকারীদের জন্য। একটি নির্দিষ্ট পরিষেবা ব্যবহার করলে বা নির্ধারিত অঙ্কের লেনদেন করলে বিকাশ ব্যবহারকারীদের জন্য সুযোগ আসতে পারে আর্জেন্টিনা দলের মার্চেন্ডাইজ জেতার। এ ছাড়া মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগও হতে পারে। বিশ্ব সফর করা আর্জেন্টিনা দলের ম্যাচ সৌভাগ্যবান বিকাশ ব্যবহারকারীদের মাঠে বসে দেখার সুযোগ হতে পারে, এমনটাই জানা গেছে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের কেউ কেউ আসতে পারেন, ভক্তদের সঙ্গে নানান অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন, এমন অনেক কর্মসূচির কথাই জানা গেছে যা এখনো দুই পক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, ২০১২ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করেছিল মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারটেল। দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় ম্যানইউর জয় করা প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি প্রদর্শন, ফুটবল কোচিং ক্যাম্প, কুইন্টন ফরচুন ও ডুইট ইয়র্কের মতো তারকা খেলোয়াড়রা এসে গেছেন। বাংলাদেশের একদল খুদে ফুটবলারকে ম্যানইউর একাডেমিতেও প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিকাশের পরিকল্পনাতেও এমন অনেক কিছুই আছে যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নে আশাবাদী দুপক্ষ।

বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশন ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম দেশ রূপান্তরকে এ অংশীদারত্বের ব্যাপারে বলেন, ‘আর্জেন্টাইন ফুটবল এবং আর্জেন্টাইন সুপারস্টারদের সঙ্গে বাংলাদেশের যারা অগণিত ভক্ত এবং অকুণ্ঠ সমর্থন আছে তাদের আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের প্রতি, এ দুপক্ষের মধ্যেই একটা যোগাযোগের সূত্রপাত হলো। তারা এখন বাংলাদেশের ভক্ত, সমর্থকদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে, বিকাশের মাধ্যমে। তারা শুধু ফুটবলের মাধ্যমে সাম্য ও সৌহার্দ্যরে কথা বলছেন তাও নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের কাছে উদাহরণ। বিকাশ মোবাইলে আর্থিক সেবার একটি চ্যাম্পিয়ন প্রতিষ্ঠান। ফলে এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে, আর্থিক অংশীদারত্বের বিষয়টি যেমন সামনে চলে আসবে, তেমনি অগ্রসরমাণ জাতি হিসেবে বাংলাদেশ এগিয়ে আসছে সেটাও বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হবে।’

এ বছর আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের বাংলাদেশে খেলতে আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি। হয়তো বিকাশের হাত ধরে আগামীতে কখনো সেটা হয়ে যেতেও পারে। বিশ্বসফরে আর্জেন্টিনা দল যে প্রীতি ম্যাচগুলো খেলবে, সেসবে কয়েকটা আসনে বিকাশের কল্যাণে দেখা যেতে পারে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদেরও। কোনো প্রতিদানের আশায় তো আর ডিয়েগো ম্যারাডোনা বা মেসিকে ভালোবাসেনি বাংলাদেশের মানুষ, ভালোবেসেছে ফুটবলের জাদুতে মুগ্ধ হয়েই। সেই ভালোবাসার বিনিময়ে সামান্য কিছুও যদি মেলে, ফিফা র‌্যাংকিংয়ের ১৯২তম দেশের জন্য, সেটাই তো অনেক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত