বেশ কয়েক মাস ধরেই পোশাক মালিকরা দাবি করে আসছিলেন বৈশি^ক ও দেশীয় নানান পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। এর প্রভাবও পড়েছে গত এপ্রিল মাসের রপ্তানি আয়ে। আগামী ৫ বছর রপ্তানিতে উৎসে কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করাসহ আসন্ন বাজেটে নন-কটন পোশাক রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে ‘পোশাকশিল্পের সার্বিক পরিস্থিতি’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান।
তিনি বলেন, নন-কটন পণ্যের বৈশ্বিক বাজার এবং আমাদের রপ্তানি সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে বিনিয়োগ ও রপ্তানি উৎসাহিত করতে এবং প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে নন-কটন পোশাক রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ (রপ্তানি মূল্যের) হারে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের জন্য আগামী বাজেটে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই। এই বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা হলে আমাদের রপ্তানি বাড়বে, নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে, সর্বোপরি সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়বে।
তিনি বলেন, বিগত চার দশকে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও পণ্যের ম্যাটেরিয়াল ডাইভারসিফিকেশন তুলনামূলক কম হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের রপ্তানি অনুযায়ী আমাদের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ ছিল কটনের তৈরি, যা ১৩ বছর আগে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৬৯ শতাংশ, অর্থাৎ বিগত ১০ বছরে আমাদের শিল্পের কটননির্ভরতা বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নন-কটন পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক।
ফারুক হাসান বলেন, বর্তমান বিশ্বে ভোক্তাদের ক্রমাগত জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নন-কটন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। যেখানে বিশ্বে মোট টেক্সটাইল কনজাম্পশনের প্রায় ৭৫ শতাংশই নন-কটন এবং কটনের শেয়ার মাত্র ২৫ শতাংশ; বর্তমানে বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের ৫২ শতাংশ পণ্য নন-কটনের, সেখানে আমাদের নন-কটন পোশাকের রপ্তানির মাত্র ২৬ শতাংশ।
বিগত দশকে আমাদের দেশে নন-কটন, বিশেষত ম্যান-মেড-ফাইবার খাতে কিছু বিনিয়োগ হলেও এসব বিনিয়োগ মূলত মূলধন এবং টেকনোলজিনির্ভর।
স্থানীয় পর্যায়ে স্থাপিত রিসাইকেল ফাইবারে ভ্যাট মওকুফের দাবি করে তিনি বলেন, রিসাইকেল ফাইবার উৎপাদনকারী মিলে ব্যবহৃত কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরবর্তী সময়ে উৎপাদিত মিল কর্তৃক স্থানীয় স্পিনিং মিলে তা সরবরাহের ওপর ধার্যকৃত যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট মওকুফ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাছাড়া স্থানীয় শিল্পের মতো স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কটন ওয়েস্টসহ সব ধরনের গার্মেন্টস ওয়েস্ট উৎপাদনকারী মিলগুলোর কাঁচামাল ঝুট আমদানিতে সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান দিতে হবে। কাটা পোশাক আমদানিতে সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও শুল্কমুক্ত সুবিধাও চান এ ব্যবসায়ী নেতা।
সরকারের কাছে কিছু ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা চেয়ে তিনি বলেন, রপ্তানির বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর ১ থেকে হ্রাস করে আগের মতো শূন্য ৫০ শতাংশ করে আগামী ৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর করা। এটি করা হলে উদ্যোক্তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মধ্য মেয়াদি ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবেন।
তৈরি পোশাক শিল্পের এসেসমেন্টের সময় কর আরোপকালে অন্য আয় ও বিবিধ খরচকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য করে স্বাভাবিক হারে ৩০ শতাংশ কর আরোপ না করে করপোরেট কর হার ১২ শতাংশ হারে আরোপ করা।
তার মতে, তৈরি পোশাক শিল্পের সাব-কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে আয়কর অধ্যাদেশের রুল-১৬ এর টেবিল-১ এর আওতায় সাব-কন্ট্রাক্ট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চুক্তির মূল্য পরিশোধের সময় প্রস্তাবিত ধাপ অনুযায়ী উৎসে কর ধার্য করা প্রয়োজন। রপ্তানি বাণিজ্যের বৃহত্তর স্বার্থে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানিকারকদের ইআরকিউ থেকে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য পরিশোধিত ফি থেকে উৎসে আয়কর কর্তনের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা প্রয়োজন।
একইভাবে, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার। যেহেতু নগদ সহায়তা কোনো ব্যবসায়িক আয় নয়, তাই নগদ সহায়তার অর্থকে করের আওতার বাইরে রাখাই যুক্তিসংগত।
