তিন দিনের বিরল প্রতিবাদ ও সংঘাতের পর স্বস্তির আভাস মিলেছে পাকিস্তানে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তারকে অবৈধ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে তাকে অবিলম্বে মুক্তিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে ইমরানের গ্রেপ্তারের বৈধতার আবেদনের শুনানি হয়। প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়ালের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ শুনানি নেয়। শুনানির একপর্যায়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ইমরান খানকে হাজির করার নির্দেশ দেয় আদালত। সে অনুযায়ী ইমরানকে হাজির করা হয়। পরে শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেয় আদালত।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ বলছে, ইমরান খান গতকাল প্রধান বিচারপতির কাছে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি চাইলেও তিনি তাকে শুক্রবার ফের ইসলামাবাদ হাইকোর্টে হাজির হওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশে এ সময় পর্যন্ত ইমরান খানকে পুলিশ লাইনস গেস্ট হাউজে রাখা হবে। তবে তাকে বন্দি হিসেবে গণ্য করা হবে না। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ পুলিশপ্রধানকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, আদালতের এ নির্দেশ তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থকদের জন্য দারুণ স্বস্তির। প্রিয় নেতার গ্রেপ্তারের পরপরই তার মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ গড়ে ইমরানের গ্রেপ্তার অবৈধ ঘোষণা প্রধান বিচারপতির তুলেছিলেন তারা।
মঙ্গল ও বুধবার দেশটির বিভিন্ন শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তার সমর্থকদের সংঘর্ষে কমপক্ষে আটজন নিহত এবং ২৯০ জন আহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন ১ হাজার ৯০০ বিক্ষোভকারী। এদিকে ইমরানকে গ্রেপ্তারের পর সেনা স্থাপনার ওপর হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দপ্তরও ক্ষোভ জানিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঞ্জাব, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও ইসলামাবাদে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই পিটিআইয়ের যুদ্ধংদেহী সমর্থকদের উৎফুল্ল দেখা গেছে। পিটিআই নেতারাও জানিয়েছেন, শুক্রবার ইসলামাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশের পরই নতুন পদক্ষেপ নেবেন না।
ইমরানও আদালত থেকেই তার সমর্থকদের শান্ত থাকার অনুরোধ করে বলেছেন, দেশের জন্য ক্ষতি বয়ে আনা উচিত হবে না।
গত মঙ্গলবার ইসলামাবাদের আদালত চত্বর থেকে আল কাদির ট্রাস্ট মামলায় গ্রেপ্তার করার পর বুধবার ইসলামাবাদের বিশেষ আদালত (অ্যাকাউন্টেবিলিটি কোর্ট) ইমরানের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। তাকে জাতীয় জবাবদিহি সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (এনএবি) জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা। এর মধ্যে এ গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে পিটিআই। গতকাল প্রধান বিচারপতি উমর আতা বন্দিয়াল, বিচারপতি মুহাম্মদ আলি মাজহার এবং বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এ আবেদনের শুনানি শুরু হয়। শুনানি চলাকালে ইমরানকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা দেশের বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য অসম্মানের বলে প্রধান বিচারপতি উমর আতা বন্দিয়াল মন্তব্য করেন। পরে ইমরানকে এক ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ইমরানকে আদালতে নেওয়া হয় এরও প্রায় এক ঘণ্টা পর, বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে। ১৫টি গাড়িবহরের কড়া নিরাপত্তায় ইমরানকে আদালতে নেওয়া হয়। এরপর ইমরানের উপস্থিতিতেই তাকে গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে পিটিআইয়ের আবেদনের শুনানি ফের শুরুর পর প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল ইমরানকে গ্রেপ্তার বেআইনি উল্লেখ করে তাকে আবার ইসলামাবাদ হাইকোর্টে যাওয়ার ওই নির্দেশ দেন।
উমর আতা বান্দিয়াল বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে, ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ অবৈধ। ইসলামাবাদের হাইকোর্টে ইমরানের মামলার শুনানি আগামীকাল শুরু হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং বলেন, আদালত যে সিদ্ধান্ত শোনাবে তা আপনাকে মেনে নিতে হবে।
এর জবাবে ইমরান খান আদালত কক্ষে উপস্থিত গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে সমর্থকদের বার্তা দিয়ে সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। আদালতকে পিটিআই চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি দেশের কোনো ক্ষতি চাই না, জনগণকেও প্ররোচিত করতে চাই না। আমি শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।’
পিটিআইয়ের আবেদনের শুনানি চলাকালে ইমরান খানের আইনজীবী হামিদ খান শীর্ষ আদালতকে জানিয়েছিলেন, তার মক্কেল ইসলামাবাদ হাইকোর্টে গ্রেপ্তার-পূর্ব জামিনের জন্য আবেদন করেছিলেন। হাইকোর্ট থেকে ইমরানকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন তার বায়োমেট্রিকস করানোর প্রক্রিয়া চলছিল। এ সময় রেঞ্জাররা কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই কক্ষে প্রবেশ করে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করে। তার সঙ্গে তারা খারাপ আচরণ করে।
পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি বন্দিয়াল তখন বলেছিলেন, আদালত আজ একটি উপযুক্ত আদেশ জারি করবে। আদালত বিষয়টি ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইমরান খান যে মামলার জন্য জামিন চাইছিলেন সেটিও খতিয়ে দেখেন বন্দিয়াল। আদালতের রেকর্ডে দেখা যায়, মামলার শুনানি নির্ধারিত ছিল না। ইমরানের আইনজীবী জানান, বায়োমেট্রিক পদ্ধতি সম্পন্ন না করে আবেদন দাখিল করা যায় না।
এ প্রেক্ষাপটে বিচারপতি আতাহার মিনাল্লাহ দেখেন যে, ইমরান খান প্রকারান্তরে আদালতে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘ন্যায়বিচারের অধিকার থেকে কাউকে কীভাবে বঞ্চিত করা যায়?’
প্রধান বিচারপতি বন্দিয়াল তখন বলেন, আদালতের প্রতি বিশেষ কিছু সম্মান দেখানোর বিষয় আছে। অতীতের একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর আগেও এনএবি সুপ্রিম কোর্টের পার্কিংস্থল থেকে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। আদালত তখন গ্রেপ্তারের নির্দেশ প্রত্যাহার করেছিল।’
প্রধান বিচারপতি ইমরানের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, কতজন রেঞ্জার্সকর্মী আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিল। জবাবে আইনজীবী জানান, ১০০ জন প্রবেশ করেছিল। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, ‘আদালত প্রাঙ্গণে ৯০ জন লোক প্রবেশ করলে তার মর্যাদা থাকে কীভাবে? আদালত চত্বর থেকে কীভাবে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা যায়? যদি কোনো ব্যক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ করে থাকে, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করার অর্থ কী?’
তিনি বলেন, ‘এনএবি আদালত অবমাননা করেছে। গ্রেপ্তারের আগে তাদের আদালতের রেজিস্ট্রারের অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল। আদালতের কর্মীরাও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন।’
আদালত এনএবির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ পুনঃপর্যালোচনা করে দেখবে বলে জানিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি।
