অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা বিল কার স্বার্থে?

আপডেট : ১৪ মে ২০২৩, ০৯:৫৬ পিএম

অত্যাবশ্যক বলতে আমরা বুঝি, যা না হলেই নয়। আমাদের জীবনে অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে কিন্তু কিছু কিছু জিনিস না হলে জীবন চলে না। সেই সব দ্রব্য উৎপাদন, সরবরাহ, ভোগ যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় তা দেখা সরকারের কাজ। এ কথা কেউ অস্বীকার করবেন না। ফলে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা সংক্রান্ত আইন হলে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু  সরকার যা বলে এবং যা করে তার মধ্যে ফারাক দেখতে দেখতে জনগণ এখন সরকারের ঘোষণা শুনলে সন্দেহ করে। গত ৬ এপ্রিল ২০২৩ সালে সংসদে তেমনি একটি বিল উত্থাপন করলেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী। শ্রম প্রতিমন্ত্রী কোনো বিল উত্থাপন করলে শ্রমিকদের আনন্দিত হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি যে বিল উত্থাপন করেছেন তাতে শ্রমিকরা প্রথমে হতবাক, তারপর আতঙ্কিত এবং শেষে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।  

সংসদে উত্থাপিত অত্যাবশ্যকীয় সেবা খাতে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার এই বিলকে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ফলে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পদক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলেছেন, ধর্মঘটের অধিকার একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। সাধারণত শ্রমিকরা বা তাদের সংগঠনসমূহ পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে বাধ্য হয়। আলাপ-আলোচনার সমস্ত দরজা বন্ধ হলেই কেবলমাত্র তারা ধর্মঘট আহ্বান করে থাকেন। প্রতিবাদের এই সর্বশেষ অধিকার কেড়ে নেওয়ার অর্থ হলো শ্রমিকদের ওপর বিনা বাধায় নিপীড়নের অধিকার সম্প্রসারিত হওয়া। আর অত্যাবশ্যকীয় সেবা খাতের কথা যদি বলতে হয় তাহলে শ্রমিকরা কাজ করেন এমন কোন খাত আছে যা অত্যাবশ্যকীয় নয়? এমন কোন খাত নেই যা অত্যাবশ্যকীয় সেবা খাতে অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না।

ফলে তাদের আশঙ্কা যে, ভবিষ্যতে এই আইনের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং সংবিধান ও শ্রম আইন স্বীকৃত অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। জরুরি সেবা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শ্রমিকের অধিকারও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার জন্য এখনো শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়। আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, এই বিল আইনে পরিণত হলে তা শুধু ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে সংকুচিত করবে তাই নয়, শ্রমিকদের আইনসংগত আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে  বলা হয়েছে ১৯৫২ সালের এসেনশিয়াল সার্ভিসেস (মেইনটেন্স) অ্যাক্ট এবং ১৯৫৮ সালের এসেনশিয়াল সার্ভিসেস (সেকেন্ড) অর্ডিন্যান্স রহিত করে নতুন এই আইন করা হচ্ছে। মূলত এই দুটি আইন এখন ইংরেজিতে থাকার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “যেহেতু, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত আইনগুলো বাংলা ভাষায় প্রণয়ন করা আবশ্যক। সেহেতু, অত্যাবশ্যক পরিষেবা বিল, ২০২৩ মহান জাতীয় সংসদের সদয় বিবেচনার জন্য উত্থাপন করা হলো।” 

সংসদীয় কমিটি বিলটির ওপর তাদের রিপোর্ট আবার সংসদে উপস্থাপন করার পর সেটি সংসদে পাস করানোর জন্য উত্থাপন করা হবে। বিলটি সংসদে পাস হয়ে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইনে পরিণত হবে। এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় এই যে ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকার এই আইন প্রণয়ন করেছিল, তারপর ১৯৫২ সালে পাকিস্তান মুসলিম লিগ এবং ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের ইস্কান্দার মির্জার সময়কালে প্রণীত এই আইন বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে স্বাধীনতার ৫২ বছর পর আবার শ্রমিকদের ওপর প্রয়োগ করা হবে।

সংসদ যেভাবে চলে বা যেভাবে আইন প্রণয়ন হয় সে কথা বিবেচনা করলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সংসদে তেমন বিতর্ক হবে না, দু-একজন সাংসদ মৃদুকণ্ঠে আপত্তি করতে পারেন কিন্তু তা দ্বারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না। ফলে সরকারের অভিপ্রায় অনুযায়ী বিলটি আইনে পরিণত হবে। এবং এটি মালিকদের সুরক্ষা কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজে প্রয়োগ করা করা হবে। বিলে যেসব বিধিবিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে সরকার জনস্বার্থে দরকার মনে করলে কোনো জরুরি বা অত্যাবশ্যক পরিষেবার ক্ষেত্রে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করতে পারবে। আবার শাস্তির ব্যাপারটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন, সরকার ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার পরও যদি কোনো ব্যক্তি ধর্মঘট শুরু করেন বা অব্যাহত রাখেন তাহলে তিনি এক বছর কারাদণ্ড, বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কেউ যদি কোনো ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করেন বা ধর্মঘট চলমান রাখার জন্য উৎসাহিত করেন তাহলে ৬ মাস কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আবার কেউ যদি ধর্মঘট চলমান রাখার জন্য বা সমর্থন করার জন্য চাঁদা প্রদান করেন তাহলে ১ বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

প্রশ্ন উঠতে পারে জরুরি সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার গুরুত্ব আছে। আবার সংগঠন বা প্রতিবাদের অধিকার তো সাংবিধানিক। অন্যায় হবে কিন্তু জরুরি সেবার অজুহাতে শ্রমিকের প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই আইন বাস্তবে শ্রমিকদের মুখ বুজে সব মেনে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ফেলবে এবং মালিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার করা হবে।  

বিলে বলা হয়েছে, “জননিরাপত্তা বা জনগণের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, এ ধরনের কোনো পরিষেবাও আইনের আওতাভুক্ত থাকবে।” “জনগণের জন্য অসহনীয় কষ্টের কারণ হচ্ছে বা হওয়ার শঙ্কা আছে এমন পরিষেবা এবং দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারা দেশ বা দেশের কোনো অংশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় কোনো বিষয়ও অত্যাবশ্যক পরিষেবার আওতাভুক্ত হবে।” তাহলে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার বাইরে আর কোন খাত অবশিষ্ট রইল? যা বাকি আছে তা সরকার চাইলে বা সরকারের কাছে অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে হলে সে সব খাত এই আইনের আওতায় চলে আসবে।  

বিলে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্র বিবেচনায় সরকার চাকরি বা চাকরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পরিষেবাকে অত্যাবশ্যক পরিষেবা হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। এর ব্যাখ্যা করতে গেলে কোনো কিছুই বাকি থাকবে না। যেমন সড়কে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে জনকল্যাণমূলক সেবা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এ রকম চাকরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পরিষেবাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার অত্যাবশ্যক পরিষেবা ঘোষণা করতে পারবে।

শ্রমিকের যত অসন্তোষ তার অধিকাংশই ঘটে জীবিকা এবং জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে। অন্যায়ভাবে ছাঁটাই, আকস্মিক কারখানা বন্ধ, প্রাপ্য না দেওয়া, চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন না করার মতো পরিস্থিতি যখন তৈরি হয় তখন শ্রমিকদের শেষ হাতিয়ার ধর্মঘট। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তাই বলা হয় আমাদের দাবি যদি না মানা হয় তাহলে কিন্তু আমরা ধর্মঘটে যাব। সে কারণেই ধর্মঘটের অধিকার শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের রক্ষাকবচ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উচিত ন্যায্য মজুরি, জীবনের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য অধিকারকে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা। আইন হওয়া উচিত যে শ্রমিকের অত্যাবশ্যকীয় অধিকার কোনোভাবেই  লঙ্ঘন করা যাবে না। কোটি কোটি শ্রমজীবীর পক্ষ থেকে এখন প্রশ্ন উঠবে কোনটা অত্যাবশ্যক? কোটি শ্রমিকের অধিকার নাকি মুষ্টিমেয় মালিকের অন্যায় স্বার্থ?  

বাংলাদেশ শ্রম আইনে পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত আছে, এই আইনের অন্যত্র ভিন্নরূপ কিছু নির্ধারিত না থাকিলে, এই আইন সমগ্র বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য হইবে। ‘শ্রম আইনের চতুর্দশ অধ্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত ধারাসমূহ আছে। ২০৯ ধারায় শিল্প বিরোধ উত্থাপন, ২১০ ধারায় শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ২১২ ধারায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধর্মঘট শুরু করার ব্যর্থতা, ২২৫ ধারায় শ্রম আদালত কর্র্তৃক ধর্মঘটের নোটিস জারির ওপর বিধিনিষেধ, ২২৬ ধারায় শ্রম আদালত কর্র্তৃক ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা, ২২৭ ধারায় কখন ধর্মঘট বেআইনি হবে সেসব যেমন উল্লিখিত আছে তেমনি ২৯৪ ধারায় বেআইনি ধর্মঘটের দণ্ড, ২৯৫ ধারায় বেআইনি ধর্মঘটে প্ররোচিত করার দণ্ড, ২৯৬ ধারায় ঢিমেতালে কাজে অংশগ্রহণ বা প্ররোচনার দণ্ড সন্নিবেশিত আছে। শ্রম আইনে ধর্মঘট আহ্বান করা এবং ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা দুই বিষয়ই উল্লিখিত আছে, তাহলে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা বিলের উদ্দেশ্য কী? 

১৯৫২ সালে আইএলও’র দ্বিতীয় সভায় সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা বিষয়ক কমিটি (কমিটি অন ফ্রিডম অফ অ্যাসোসিয়েশন) ঘোষণা করে যে ধর্মঘট করা একটি অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। ধর্মঘটের অধিকার অন্যতম প্রধান মৌলিক বিষয় হিসেবে স্বীকৃত হবে যার মাধ্যমে শ্রমিক এবং তাদের সংগঠনসমূহ তাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্বার্থের দাবি আইনসংগতভাবে উত্থাপন এবং রক্ষা করবে। এই নীতিমালা অনুযায়ী কমিটি অন ফ্রিডম অফ অ্যাসোসিয়েশন উল্লেখ করে একথা পরিষ্কারভাবে মেনে নিতে হবে যে ধর্মঘট করা একটি অধিকার যা শ্রমিক এবং তাদের সংগঠনসমূহ ভোগ করবে। 

বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ৭ কোটি ৩৪ লাখ। এই শ্রমিকরা শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বের ১৬৯টি দেশে কাজ করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করে আর রাষ্ট্রের উন্নতি ঘটায়। বাংলাদেশ বিবেচিত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সস্তা শ্রমিকের দেশ হিসেবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে ধনী হওয়ারও দেশ। শ্রমিকের কম মজুরি মালিকের বেশি মুনাফার অন্যতম প্রধান শর্ত। শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়ার জন্যই আইনের নানা বাধা তুলে তাদের সংগঠিত হতে দেওয়া হয় না, ফলে মাত্র ৩২ লাখ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য। এই সস্তা শ্রমিকের কথা বলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়। অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা আইন বাস্তবে সেই সব বিনিয়োগকারীদের সেবা করবে। সংবিধানকে বলা হয় সর্বোচ্চ আইন বা আইনের উৎস। কিন্তু  প্রস্তাবিত বিলে ধর্মঘট সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা কি ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করে না?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত