ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত করেছিল গত বছর ২৪ অক্টোবর। ঝড়টি ২০০৭ সালের ‘সিডরের’ চেয়ে কম শক্তিশালী হলেও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উপকূল। সিত্রাংয়ের পর গতকাল রবিবার আবারও কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন উপকূলে আঘাত করল ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’। যদিও জলোচ্ছ্বাস হয়নি, কিন্তু প্রচন্ড বাতাসে সেন্টমার্টিন লন্ডভন্ড হয়েছে।
সিডর থেকে মোখা পর্যন্ত অন্তত ১১টি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করেছে। আগের তুলনায় ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়েছে, যা আগে দেখা যায়নি। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছে, বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রার ভারসাম্যহীনতার কারণে বেশি বেশি ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করেছিল ‘সিত্রাং’ নামের ঘূর্ণিঝড়। এতে প্রাণহানি কম হলেও ফসল ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে অনেক। ২০২১ সালে ‘ইয়াস’, ২০২০ সালে ‘আম্পান, ২০১৯ সালে ‘ফণি’, ২০১৭ সালে ‘মোরা’, ২০১৬ সালে ‘রোয়ানু’, ২০১৫ সালে ‘কোমেন’, ২০১৩ সালে ‘মহাসেন’, ২০০৯ সালে ‘আইলা’, ২০০৮ সালে ‘নার্গিস’ ও ২০০৭ সালে সিডর উপকূলে আঘাত করেছিল। দুই বছরের মধ্যে সিডর ও আইলার মতো তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত উপকূল থেকে এখনো মুছে যায়নি। এ দুটি ঘূর্ণিঝড় বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে।
এর আগে ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বরের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তান্ডবের পর আরেকটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দেখেছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মানুষ ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। প্রলয়ংকরী সেই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দেড় লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। ’৯১ সালের পর শক্তিশালী ঝড় দেখা গিয়েছিল ২০০৭ সালে। কিন্তু এখন প্রায় প্রতি বছরই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। এর কারণ কী?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি গতকাল রবিবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের তুলনায় ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে এগুলোর শক্তিমত্তাও বেড়েছে। আর এ বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অবশ্যই রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, বিশ^জুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রা বাড়ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে। ফলে ব্যাপক নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা থেকে জন্ম নিচ্ছে ঘূর্ণিঝড়।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটর (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘আমাদের বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি থেকে তৈরি হচ্ছে নিম্নচাপ। এসব নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেশের বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রার উপাত্ত সংগ্রহ করি। কিন্তু সাগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে তাপমাত্রাবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করার কোনো পদ্ধতি নেই। সমুদ্র নিয়ে আমাদের গবেষণা আরও বাড়াতে হবে।’
এদিকে ‘মোখা’ সৃষ্টি হওয়ার আগে গত প্রায় দুই মাস ধরে উত্তপ্ত আবহাওয়া বিরাজ করছিল। বৃষ্টি কিংবা মেঘের অভাবে গত এপ্রিল মাসে দেশে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। ভূপৃষ্ঠে যে তাপপ্রবাহ ছিল একই চিত্র ছিল সমুদ্রের উপরিপৃষ্ঠে। আর এর প্রভাবেই সৃষ্টি ‘মোখা’র মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের।
আবহাওয়াবিদরা জানান, কয়েক দশক আগেও শুধু লঘুচাপ বা নিম্নচাপের মধ্যে সাগরের ঝড়গুলো সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিচ্ছে।
বৈশি^ক জলবায়ুর উষ্ণতার দায় আমরা ভোগ করছি বলে উল্লেখ করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরেরর মহাপরিচালক মিজানুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে।’ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশের উপকূল সবসময় প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ঘূর্ণিঝড় নিয়ে গত ২৫ বছর ধরে কাজ করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ এসএম কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় আগের তুলনায় এখন ঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে।’
বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর এপ্রিল-মে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হলো ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। এ সময়ের ঝড়গুলো শক্তিশালী হয়ে থাকে। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমের ঝড়গুলো মৌসুমি ঝড় হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। ঘূর্ণিঝড় একটি জলবায়ুগত প্রক্রিয়া। বছরের এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় হবে এবং তা বিদায় নেওয়ার পর দেশে বর্ষাকাল শুরু হবে। আবার বর্ষার পর ঘূর্ণিঝড় হবে এবং তখন আবার শীতের মৌসুম শুরু হবে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রধান রুট হলো মেঘনা মোহনা। কিন্তু সবসময়ে এ পথ দিয়ে না গিয়ে কখনো কখনো ডান (চট্টগ্রাম-কক্সবাজার) কিংবা বাম (খুলনা-সাতক্ষীরা) দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়।
