আইএমএফের প্রোগ্রামের জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হবে তা সবার সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। আইএমএফ যখন কোনো দেশে কর্মসূচি নিয়ে যায়, তখন সে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা করে। এ সংস্থার কর্মসূচির ফলে ওই দেশে বৈষম্যও বাড়ে। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, দেশের বাজেট এখন অনাথ হয়ে গেছে, আইএমএফ তার পালক পিতা।
গতকাল সোমবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সিপিডি-নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘আইএমএফের সময়কালে অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের কথা জাতীয় বাজেটে কীভাবে প্রতিফলিত হতে পারে’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন।
মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামালের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সংলাপে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সংসদ সদস্য রানা মোহাম্মদ সোহেল, বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
আইএমএফের কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, এ অঞ্চলের চারটি দেশ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালে তারা শর্তারোপের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে এসেছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পৃথিবীর অর্থনীতির উদাহরণ বলে আইএমএফ যখন কোনো দেশে কর্মসূচি নিয়ে যায় বা সংস্কারের শর্ত দেয় তখন তারা একক কর্তৃত্ব স্থাপন করে থাকে। বাংলাদেশ বেশ কিছু সংস্কারমূলক কর্মসূচি শুরু করেছে। এমনিতেই বাংলাদেশে বৈষম্য বেশি, আইএমএফের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে বৈষম্য আরও বাড়াবে। তারা যেসব শর্ত দেয়, তার কারণেই বৈষম্য বাড়ে। যা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, এমনকি আইএমএফের নিজস্ব গবেষণায়ও এটা উঠে এসেছে।
আইএমএফ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, যাদের জন্য এই আইএমএফ কর্মসূচি নেওয়া হয় তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের মতামত না নিয়ে আইএমএফ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে আরও বৈষম্য বাড়বে। ভর্তুকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভর্তুকি অনেক সময় ভালো হয়, আবার খারাপও হয়। বিদ্যুৎ খাতে যে বিপুল পরিমাণে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে সার ও ডিজেলের মতো খাতেও ভর্তুকি বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া আইএমএফ বাড়তি কর আদায়ের প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, এর সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কিন্তু কাদের কাছ থেকে সেই কর আদায় করা হবে, সেটাই বড় কথা। এক্ষেত্রে যারা করের বাইরে আছে তাদের এর আওতায় আনতে হবে।
দেবপ্রিয় বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে তবে সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিগুলো অনেক সময় প্রচারের অভাবে দরিদ্র মানুষের নজরে আসে না। সেজন্য তারা সেগুলোর সুবিধা নিতে পারে না। এছাড়া যারা বিতরণ করে তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে তারা ঠিকমতো দেয় না।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের বাজেটের আকার নিয়ে বরাবরই আলোচনা হয়। বলা হয় অনেক বড় বাজেট নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাজেট বাংলাদেশে। সেই হিসাবে বাজেট হওয়ার কথা ১২ লাখ কোটি টাকার ওপরে। তিনি বলেন, আসলে বাজেটের আকার নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। অর্থ বরাদ্দটাই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের সঙ্গে তুলনা না করে ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেট করা উচিত। এবং বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বাজেটের ক্ষেত্রে আইএমএফ বড় বিষয় না। বাজেট আমাদের নিজস্ব। আইএমএফ শুধু একটা সাইট। তারা কোনো শর্ত দেয়নি। তারা যে ঋণ দিচ্ছে সেটা কীভাবে ওঠাবে সেটার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে। এটাকে শর্ত হিসেবে মানতে নারাজ। বাজেটে দরিদ্র, শিশু এবং অসুবিধাগ্রস্তদের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের দরিদ্ররা বঞ্চিত এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারা আসলে ব্যবস্থাপনাগতভাবেই বঞ্চিত। এটা আমাদের জন্য বড় সমস্যা। ছোট ছোট হলেও তাদের জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।
এম এ মান্নান বলেন, আমার এলাকায় আমি সরকারি মাল নিয়ে যাই কিন্তু সেগুলো কোথায় যায় আমি জানি না। তিনি বলেন, দেশের অবস্থা এখন এমন, প্রণোদনা নিয়ে এক ধরনের উন্মাদনা চলছে। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য আলাদা চিন্তা করার থেকে বাজেট হওয়া উচিত সুসংগত। বাজেট যদি সুসংগত হয় তাহলে সবার জন্য উপকার হবে। আলাদা আলাদা বাজেট করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি।
ভর্তুকির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ভালো ভর্তুকি বাড়াতে হবে। আর মন্দ ভর্তুকি কমাতে হবে। দেশে প্রণোদনার নামে উন্মাদনা চলছে। এটা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
অনুষ্ঠানে বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য কমানোর জন্য সরকার কী করছে সেটা কেউ জানে না। রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, করের আওতা না বাড়িয়ে যারা কর দিচ্ছে তাদের ওপর আরও চাপ বাড়ানো হচ্ছে। যারা কর দিচ্ছে না, টাকা পাচার করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের করের আওতায় আনতে হবে।
