নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের জাতীয় নির্বাচন ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আসনটি আওয়ামী লীগের একপ্রকার দুর্গ। সংসদ নির্বাচনেও জয়ের পাল্লা আওয়ামী লীগেরই ভারী। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলটির সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনকে মোকাবিলা করতে হতে পারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে।
সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি থেকে ২০০৮ সাল থেকে টানা তিনবার নির্বাচিত রমেশ সেনের নিজের কিছু অনিয়ম, দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও শেষ সময়ে এসে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় আওয়ামী লীগের জয় ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে বলে দাবি করেছেন দলটির প্রভাবশালী এক নেতা। তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের বড় অংশের ভোট মূলত নৌকার বিজয়কে নিশ্চিত করে। এমপির গাছাড়া ভাব এবার সেখানে পেছনে ফেলে দিয়েছে সরকারি দলকে। তাছাড়া বিরোধীপক্ষের সম্ভাব্য প্রার্থীও শক্তিশালী। আওয়ামী লীগ যদি নতুন কাউকে মনোনয়ন দেয়, লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে তিনি মনে করেন।
জেলা যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ আসনে ভোটার আছে সাড়ে পাঁচ লাখের মতো। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ভোট রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায় ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। তিনি বলেন, ‘সবসময় আওয়ামী লীগের প্রতি সংখ্যালঘু ভোটারের আস্থা থাকলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে দৃশ্যমান কিছু করা হয়নি।’
যুবলীগের এ নেতা আরও বলেন, এ আসনে জাতীয় পার্টি ও বাম দলের ভোটও আছে। এ ভোটও জয়-পরাজয়ের অন্যতম ফ্যাক্টর। জাতীয় ইস্যু, বিশেষ করে নিত্যপণ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির এক নেতা বলেন, দলের ভেতর এমপির ভাবমূর্তিও বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ তার পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ দলে অনৈক্য তৈরি করেছে। ভোটের আগে ঐক্য ফেরানো সম্ভব না হলেও বিপদের সম্ভাবনা দেখছেন ওই নেতা।
তবে দেবীপুর ইউনিয়নের সাধারণ এক তরুণ ভোটার বলেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এমপি রমেশ অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু ভোটে সবসময় কাজ সুফল দেয় না। এখানে দলীয় নেতাকর্মীর আচার-আচরণ, ক্ষমতার চর্চা, স্থানীয় আচার-বিচারে কতখানি নিরপেক্ষ এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে এমপি বা এমপির দলবল কতখানি সহনশীল এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন একজন ভোটার। তার দাবি, এসব হিসাব করলে বর্তমান সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন ভোট বাড়িয়েছেন তা বলা যাবে না।
সদর উপজেলার এক ব্যবসায়ী বলেন, এমপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ কোনো কাজে তার কাছে গেলে শুরুতেই খারাপ ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী থাকায় ও বর্তমান এমপির জনপ্রিয়তায় চিড় ধরায় আওয়ামী লীগের জন্য নিশ্চিত আসনটি কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে আছে। তবু বলা যায়, নৌকা জেতার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ।
তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের আরও দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী আছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন দলের ঠাকুরগাঁও জেলা কমিটির সভাপতি সাদেক কোরাইশী ও সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার রায়। সংখ্যালঘু ভোট বিবেচনায় দীপককে অনেকে এগিয়ে রাখছেন।
১১টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দুবার ও বিরোধী বিএনপি তিনবার ভোট বর্জন করেছে। আওয়ামী লীগ জিতেছে সাতবার, বিএনপি দুবার। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জিতেছেন। তার গ্রহণযোগ্যতা সরকারদলীয় এমপির চেয়ে বেশি বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, মির্জা ফখরুল শিক্ষক ছিলেন এবং মিষ্টিভাষী। তার কাছে সব ধরনের মানুষই অনায়াসে যেতে পারেন। বিশেষ করে তৃণমূল থেকে জেলা পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাকর্মীর নাম ধরে কাছে ডেকে নেন।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, ফখরুল দলের মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর এখানে রাজনৈতিকভাবে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের ঐক্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এমপি রমেশবিরোধী একটি অংশ দলটিকে আগের চেয়ে দুর্বল করেছে। তবে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে এসব জটিলতা নিরসন হলে আওয়ামী লীগের জয় ধরে রাখা সম্ভব।
আগামীকাল পড়ুন ঠাকুরগাঁও ২
