ঠাকুরগাঁও সদর এই একটি মাত্র উপজেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসন। ইউনিয়ন সংখ্যা ২২। বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেন। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন তিনি।
রমেশ সেনের বিরুদ্ধে অরাজনৈতিক আচরণ, মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এমপির নিয়োগ-বাণিজ্য ‘ওপেন সিক্রেট’। আসনের ২২টি ইউনিয়নের মধ্যে দেশ রূপান্তরের দুই প্রতিবেদক অন্তত ১৫টি ইউনিয়ন ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও নানা রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্তত ২৫ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এমপির বিতর্কিত কর্মকান্ড ও তার কাজের মূল্যায়ন জানার চেষ্টা করেছেন। রুহিয়া, আখানগর, আকচা, বড়গাঁও, বালিয়া, আউলিয়াপুর, চিলারং, রহিমানপুর, রায়পুর, জামালপুর, মোহাম্মদপুর, রাজাগাঁও, দেবীপুর, জগন্নাথপুর, শুখানপুকুরী, রুহিয়া পশ্চিম, ঢোলারহাট ও সেনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
রুহিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থক এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকারি দপ্তরগুলোতে নিয়োগে সরাসরি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আছে রমেশের বিরুদ্ধে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও নিয়োগে ভাগ নেন এমপি নিজে ও তার দলবল।
রমেশ চন্দ্র নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যেসব উন্নয়নকাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেসব হলো ঠাকুরগাঁও শহরে সড়ক প্রশস্তকরণসহ ডিভাইডার নির্মাণ ও লাইটিং, গ্রামাঞ্চলের কাঁচা সড়ক পাকাকরণ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ, ১০০ শয্যার ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ, ঠাকুরগাঁও-ঢাকা, ঠাকুরগাঁও-রাজশাহী-খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রেলরুটের সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা। এ ছাড়া সরকারি কলেজে সব বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স চালু, সদরের রুহিয়া ও ভুল্লীতে থানা স্থাপন। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে। ভালো কাজ করার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
তবে এমপির বিতর্কিত কর্মকান্ডও তুলে ধরেছেন ঢোলারহাট ইউনিয়নের এক যুবক। কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন দাবি করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, উন্নয়নকাজে ঠিকাদার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদাও নিয়েছেন এমপি নিজে ও তার ঘনিষ্ঠজনরা। এ ছাড়া আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আছে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, আইটি পার্ক নির্মাণ এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
এমপিকে ভোট না দেওয়া রাজাগাঁও, দেবীপুর ও নারগুন ইউনিয়নের তিন ভোটার তার সম্পর্কে বলেন, এলাকার উন্নয়নে রমেশ চন্দ্র সেন কাজ করেছেন, যা সারা দেশেই হয়েছে। ওই তিন ইউনিয়নের এমপিকে ভোট না দেওয়া তিনজনের মূল্যায়ন হলো, উন্নয়নে যেসব কাজ হয়েছে তা সরকারের চলমান কার্যক্রম। কিন্তু স্থানীয় সমস্যা সমাধানে এ সংসদ সদস্য তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি এবং সাধারণ মানুষ তার কাছে অবমূল্যায়ন পায়। এটি সদর আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমপির কিছু ভালো কাজের কথাও জানান তারা। এর মধ্যে সদর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং হাসপাতালে শিশুদের চিকিৎসায় আলাদা ইউনিট চালু করা।
সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে এমপি রমেশের অবদান সম্পর্কে পাঁচটি ইউনিয়ন সভাপতি ও জেলার শীর্ষ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক এমপির যেকোনো পরামর্শ ও সুপারিশ রাখতে সবাইকে বাধ্য করা হয়। তার কথার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কারও রক্ষা নেই। তারা বলেন, সারা দেশের মতো এখানেও এমপি বলয় রয়েছে। তারা যা করবে সবকিছুই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন এমপি। আত্মীয় বলয়ও সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করে। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির এক নেতা বলেন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে এমপি রমেশের পক্ষপাতিত্ব ও মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে দলের জেলা ও সদর উপজেলা শাখার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনে দলের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
অভিযোগ ও দলীয় কর্মকান্ড বিষয়ে রমেশ চন্দ্র সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই আসন থেকে আমি চারবার এমপি হয়েছি। আগামীবারও আমি মনোনয়ন চাই। প্রতিশ্রুতির ৯৫ শতাংশ কাজ আমি সম্পন্ন করেছি। বাকি ৫ শতাংশ হয়ে যেত। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। আগামীবার এই ৫ শতাংশ কাজও শেষ করে ফেলব। উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকার ২৫ হাজারের বেশি লোককে চাকরি দিয়েছি। এক টাকাও নিইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি একজন ভালো রাজনীতিককে খুঁজছি এই এলাকায়। খুঁজে পেলে আমি রাজনীতি থেকে অবসর নেব।’
