'২০১৯ সাল, রুয়েটের সেকেন্ড ইয়ার। একটা ম্যাথ কোর্সেও পাস করিনাই। নোটিশ দিলো, ওই ইয়ারেরসহ নাকি তিনটা ব্যাকলগ দেওয়া লাগবে। ক্লাস, ল্যাব। তার ওপর আমার পার্ট টাইম খ্যাপ মারা আপওয়ার্কের প্রজেক্টের ডেডলাইন। পদ্মার পাড়ে বইসা ভাবতেছিলাম, সাঁতার জানিনা, লাফ দিলে কি মইরা যাব' বলছিলেন জাহ্নবী রহমান।
জাহ্নবী জনপ্রিয় ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের তৈরি করা এশিয়ার ৩০ বছরের কম বয়সী উদ্যোক্তা ও সমাজ পরিবর্তনকারীর (চেঞ্জমেকার) তালিকায় জায়গা পাওয়াদের একজন ও রিলাক্সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
সেদিন লাফ দিলেও শতভাগ মারা যাবেন এমন নিশ্চয়তা না পেয়ে আত্মহত্যার রাস্তা থেকে ফিরে এসেছিলেন জাহ্নবী।
ফোর্বসের তালিকায় নিজের নাম দেখে কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের জবাবে জাহ্নবী রহমান বলেন, ' সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে মেইলটা দেখার পর, এক নিমিষে লাস্ট ৫ ইয়ার ফ্ল্যাশব্যাক হল চোখের সামনে'।
তিনি জানান, 'এই অর্জন শুধু আমার নয়। যারা নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্ট্রাগল করছে আমার এই অর্জন তাদের জন্য। আগামী দিনে বাংলাদেশে যেন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কোন মানুষ একা বোধ না করে, সেবা বঞ্চিত না হয় সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রিলাক্সি ও জাহ্নবি কাজ করে যাবে' বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
২০১৯-২০২১ এই ৩ বছর অনেকবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন জাহ্নবী, কিন্ত বারবার নিজের মায়ের চেহারাটা সামনে চলে আসায় সে যাত্রায় ফিরে আসেন মৃত্যুর পথ থেকে। একটা সময় তিনি উপলব্ধি করলেন, 'আশপাশে এমন অনেক বন্ধু, শিক্ষক এবং মানুষজন আছেন যারা সাপোর্ট তো করে না, উল্টো আরও এটা মাথায় ঢুকিয়ে দেয় যে, মরে গেলে বেঁচে যাব'।
এই কষ্ট ও হতাশা যাতে আর কাউকে পেতে না হয়, সেই চিন্তা থেকে ২০২১ এর নভেম্বরে রিল্যাক্সি শুরু করেন। রিলাক্সির যাত্রা শুরুর গল্প জানতে চাইলে, তিনি মুহূর্তে ফিরে যান অতীতে।
অতীত স্মৃতি থেকে জাহ্নবী জানান, ২০১৯ সাল থেকে নাইমুল হক জয়, সামিউল ইসলাম স্বপ্নিল ও জাহ্নবী রহমান একসাথে কাজ করছেন। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট),গাজীপুর থেকে পড়াশোনা করেন স্বপ্নিল ও জাহ্নবী, আর জয় পড়াশোনা করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে।
শুরুর দিকে তারা ১৮ বছরের কম বয়সী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে গ্যামিফিকেশ (অনুর্ধ্ব ১৮ বয়সীদের সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) শুরু করেন। ২০২১ সালে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) কিছু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর তারা অনুভব করলেন, ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। ফলে তাদের বেশি সহযোগিতা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বড় অবহেলা রয়েছে।
এই চিন্তা থেকে রিলাক্সি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ শুরু করে। ২০২২ এর জুলাইয়ে প্লে স্টোরে তারা রিলাক্সি নামে অ্যাপস চালু করেন। এখন পর্যন্ত অ্যাপসটি ১৮ হাজারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। ৪ হাজারের বেশি ব্যবহারকারী নিয়মিত অ্যাপসটা ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে ফ্রিতে যোগাযোগ করতে পারে, যেকোনো সমস্যা শেয়ার করলে বিশেষজ্ঞরা তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জন্য ফ্রি থেরাপি ও মেডিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়।
