বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তুরস্কের নির্বাচন এবং পশ্চিমাদের অবস্থান

আপডেট : ২৪ মে ২০২৩, ১০:২১ পিএম

নির্বাচনে এরদোয়ান তার দুই দশকে বানানো কর্র্তৃত্ববাদী আমলাতন্ত্রের ওপর অনেকটা ভরসা করছেন। তিনি পরিকল্পিতভাবে দেশের সংবাদমাধ্যমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন। এ ছাড়া দেশটির প্রায় ৮০ হাজার মসজিদের পরিচালনা পর্ষদও তার হয়ে কাজ করবে বলে ধারণা করা হয়। তবে ২০ বছর ধরে তিনি যে দমন-পীড়ন করেছেন, তাতে সাধারণ তুর্কিদের একটি বিরাট অংশ তার শাসনের প্রতি বিরক্ত। তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তুরস্কের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা। সেখানে মূল্যস্ফীতি ৮০ শতাংশের ওপরে উঠেছে। এর মধ্যে ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৫০ হাজার লোক মরেছে। এই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তুরস্কে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো যথারীতি বলছে, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আমলের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কম-বেশি সব কটি পশ্চিমা গণমাধ্যমের আভাস হচ্ছে, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির এরদোয়ানকে হারিয়ে দিতে পারেন রিপাবলিকান পিপলস পার্টির নেতা কামাল কিলিচদারোগলু। এরদোয়ানের পরাজয় বা ক্ষমতা থেকে নির্বাসন পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। তবে এর আগে কোনো নির্বাচনে এরদোয়ান হারেননি, কিন্তু এবার পাহাড়সম চাপ নিয়ে নির্বাচনে লড়তে হচ্ছে তাকে।

অনেকেই মনে করছেন, ভূমিকম্পের আঘাতও সামলে নিয়েছেন এরদোয়ান। এবারের নির্বাচনে মূলত প্রবীণ ও মধ্য বয়স্কদের সঙ্গে তরুণ ভোটারদের মধ্যে লড়াই হবে। প্রবীণ ও মধ্যবয়স্কদের মধ্যে এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা বেশি। ওদিকে তরুণরা ভিড়ছেন কামাল কিলিচদারোগলুর ডেরায়। আবার নারী ভোটদের মধ্যে এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা বেশি। কামালপন্থিরা স্বীকার করেছেন, ১১ মিলিয়ন নারী ভোটার নির্বাচনে ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন। এই নারী ভোটাররা কামালের জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন। এ ছাড়া গ্রামীণ রক্ষণশীল সমাজে এরদোয়ানের শক্ত অবস্থান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন জরিপের আভাস হচ্ছে, এরদোয়ানের শক্ত অবস্থান ভেঙে এবার কামাল বেরিয়ে আসতে পারেন। শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকান পিপলস পার্টির গতবারের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মুহাররেম ইনচের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে সুবিধা পেতে পারেন কামাল। কিন্তু ইনচের ভোটাররা কামালকে ভোট নাও দিতে পারেন।

এরদোয়ান অভিযোগ করছেন, কামাল জিতে গেলে তুরস্কের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। তরুণরা রাস্তায় বসে মদ পান করবে। কারণ, কামাল নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে বলেছেন, তিনি তরুণদের ইউরোপের জীবন দিতে চান। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তোমরা রাস্তায় যা করতে চাও, তাই করতে পারবে। কামাল কিলিচদারোগলুর নেতৃত্বাধীন জোটকে পশ্চিমা গণমাধ্যম উদার ও আধুনিক জোট বলে প্রচার করলেও এই জোটের বিরুদ্ধে জোনোফোবিক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। খোদ কামাল কিলিচদারোগলুর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, তিনি জিতলে দুই বছরের মধ্যে সিরিয়ান উদ্বাস্তুদের ফেরত পাঠাবেন। তার ঘোষণার কারণে শুধু সিরিয়ান উদ্বাস্তুরাই না, ইরাকি ও ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তুরাও ঝুঁকির মধ্যে পতিত হবেন। আঙ্কারাসহ বিভিন্ন শহরে কামালের রিপাবলিকান পিপলস পার্টির কট্টর সমর্থকরা বিদেশিদের ধরে ধরে নাম-পরিচয় জানতে চান।

কারণ, কট্টর জাতীয়তাবাদীরা মনে করেন, উদ্বাস্তু ও বিদেশিদের কারণে তুরস্কের অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। তাদের তুরস্ক থেকে বের করে দেওয়া উচিত বলে তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন। এরপরও ভবিষ্যৎ রাজনীতির কথা মাথায় রেখেই কামাল কিলিচদারোগলুকে পশ্চিমারা সমর্থন করছে। কারণ, নানা মত ও পথের কারণে কামালের নেতৃত্বে সরকার হবে দুর্বল। এই সরকারে বামপন্থি, ইসলামপন্থি, উদারপন্থি ও কট্টর জাতীয়তাবাদীরা থাকবেন। এ ছাড়া নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও অর্থনৈতিক সংকট সম্ভাব্য কামাল সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। এসব কারণে কামালের সরকার দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে এবং কামালকে ইচ্ছামতো পরিচালনা করা যাবে। পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য সম্ভবত সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন করে দীর্ঘ মেয়াদে মিসরের সিসির মতো বিশ্বস্ত কাউকে তুরস্কের ক্ষমতায় আনা। রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে এরদোয়ানকে মুছে দিতে পারলে তুরস্ক আগের মতো পুরোপুরি পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এরদোয়ানের ওপর পশ্চিমাদের ক্ষোভের কারণ হচ্ছে, তিনি তুরস্ককে স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছেন। ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন। আরবের রাজনীতি এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ দুই অনারব রাষ্ট্র ইরান ও তুরস্ক।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রাশিয়া এ যুদ্ধে প্রবেশ করেছে ইরান ও তুরস্কের কারণেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হচ্ছে, যেকোনো মূল্যে এই দুই দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো। এরদোয়ানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বিরোধী মত দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি তুরস্কের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৪ মের নির্বাচনে এরদোয়ানের রাজনৈতিক ভাগ্য নতুন করে লেখা হবে। জিতলে তুরস্কের ইতিহাসে নতুন উচ্চতায় চলে যাবেন আর হারলে কারাবাস, মৃত্যুদণ্ড অনেক কিছুই হতে পারে। বিভিন্ন জরিপে কামালের জয়ের পাল্লা বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এখনই আশা ছাড়ছেন না এরদোয়ানের সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করে বেরিয়ে আসবেন বলে এরদোয়ানের সমর্থক-ভক্তরা প্রত্যাশা করছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ভোটারদের সবাই যে জনতুষ্টিবাদী কর্র্তৃত্বপরায়ণ শাসনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব এবং গণতন্ত্রকে হুমকির মধ্যে ফেলার বিষয়টি জানেন না, বিষয়টি মোটেও তা নয়। কিন্তু যখন তারা আমরা বনাম তারা যুক্তি ধরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং দেখেন, বিরোধী জোটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনিশ্চিত, তখন তারা মন্দের ভালো হিসেবে জনতুষ্টিবাদের ভেতরেই আশাবাদ খোঁজার চেষ্টা করেন। তুরস্কের ক্ষেত্রে এটি আরও সত্য। সেখানে বিরোধী ছয়টি দল কামাল কিলিচদারোগলুকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করলেও ছয়টি দলের কাছে তার সর্বান্তঃকরণ সমর্থন নেই। আর কামাল নির্বাচিত হলে তারা কী কী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করবেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা ভোটাররা পাচ্ছেন না। ফলে এই নেতৃত্বের পক্ষে এরদোয়ানের মতো জনতুষ্টিবাদীকে হারানো তথা গণতন্ত্রকে অধিকতর হুমকি থেকে বাঁচানো কঠিন হবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত