আরব লিগের রক্তলাল গালিচায় আসাদের প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ২৯ মে ২০২৩, ১০:৩৫ পিএম

একটি পুরনো কৌতুক হলো, আরব লিগ আসলে কোনো লিগ না আরবদের নার্সারি। আরব লিগকে আরবিতে বলে, জামিআত আদ-দুওয়াল আল-আরাবিয়া। লিগের আরবি শব্দ ‘জামিআ’। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবিও তা-ই। সম্প্রতি আসাদের নেতৃত্বে সিরিয়াকে আরব লিগে ফিরিয়ে আনা দেখে বোঝা যায়, ‘নার্সারি’ শব্দটি আরব নেতাদের অপমানের পক্ষে যথেষ্ট নয়; সংস্থাটি অযোগ্য এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া।

সিরিয়ায় যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার অর্ধেক এখন বাস্তুচ্যুত এবং কয়েক হাজার নিহত কিংবা আহত। রাষ্ট্রটি আর কার্যকর নেই। আগেকার ওয়ার-লর্ডদের মতো আসাদ উত্তর-পূর্বে মিলিশিয়া ও এসডিএফ’র সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে টিকে আছেন। তারপরও আরব লিগের মতো ‘ছাতা সংগঠন’ পুনরায় সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। সিরিয়ায় ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব চিন্তার বিষয় বটে। তেহরানের সঙ্গে সম্প্রতি সৌদির সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে সত্য। কিন্তু আরব লিগ সিরিয়াকে আবার স্বীকৃতি দেওয়ায় ইরানের প্রভাব মোটেও হারাবে না, বরং আরও প্রকট হবে। কেননা, এখন যদি উল্টাসিধা কিছু হয়, তাহলে আসাদ ইরান এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলাতে পারবে।

সিরিয়া বর্তমানে একটি ‘মাদক সম্রাজ্য’। অবৈধ ‘ক্যাপ্টাগন বাণিজ্য’ তার অর্থনীতির ফাঁপা শেলে বারুদ দিচ্ছে। অথচ আরব লিগে প্রবেশের আগে এসব সমস্যা সমাধানের কোনো প্রতিশ্রুতি তার থেকে নেওয়া হয়নি, এমনকি অগ্রগতি পর্যালোচনার কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি। রয়টার্স অবশ্য বলছে যে, আসাদ যদি মাদক ব্যবসা বন্ধ করে, তাহলে সৌদি তাকে ৪ বিলিয়ন ডলার দেবে এমন একটা গুজব আছে। কিন্তু ক্যাপ্টাগন ব্যবসা বন্ধ করতে হলে মাদক-নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। আসাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কি সেটা সম্ভব? তার শাসন, তার যুদ্ধ পরিচালনা সবই চলছে মাদকের ব্যবসা পুঁজি করে। সিরিয়ায় ক্যাপ্টাগন নেটওয়ার্কের মূল হোতাই আসাদ।

সত্য কথা হলো, সিরিয়া এখনো উদ্বাস্তুদের ঘরে ফেরার মতো নিরাপদ না। সরকার আরব লিগ নেতাদের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেই এই সত্য মিথ্যা হয় না। শরণার্থীদেরও তো ফেরার ইচ্ছা থাকতে হবে। নাকি তাদের বাধ্য করা হবে? ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে, শরণার্থীদের জোরপূর্বক ফিরিয়ে দেওয়া বেআইনি। সিরীয় উদ্বাস্তুদের ওপর করা জরিপেও দেখা গেছে, সবাই একবাক্যে বলছেন যে, আসাদ সরকার অপসারণ না হওয়া অবধি তারা ঘরে ফিরতে রাজি নয়।

বিনিয়োগ ছাড়া পুনর্গঠন সম্ভব নয় এবং এটা পুরোটাই নির্ভর করে সরকারের স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের ওপর যার কোনোটিই আসাদ দেননি। তাকে দিয়ে আশাও করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আইএমএফ কিংবা আন্তর্জাতিক অন্যান্য সম্প্রদায়ের কেউই এমন ইঙ্গিত দেয়নি যে, সিরিয়ায় পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় তারা সমর্থন জানাবে। ইউক্রেনে আগ্রাসন নিয়ে ব্যস্ত রাশিয়ার তো এ-বিষয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বা সংস্থান কোনোটাই নেই। তা ছাড়া বাস্তুহারাদের ফিরে আসা ছাড়া পুনর্গঠন একটি অর্থহীন উদ্যোগ। আবার মার্কিন ‘সিজার অ্যাক্ট’ সিরিয়ার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনাকারী অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বহু কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। সুতরাং ওয়াশিংটনও আইনি কারণে পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় অর্থায়ন করতে এগিয়ে আসবে না। সন্দেহ নেই, আসাদ চাচ্ছেন, গত ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্পকে কাজে লাগিয়ে পুনর্গঠনের ধুয়া তুলতে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সিরিয়াকে দেওয়া দাতাদের অর্থের সিংহভাগ চলে যায় আসাদের ‘বন্ধুদের’ পকেটে সিরিয়ার জনগণ কানাকড়িও পায় না।

আরব লিগের মাধ্যমে আসাদকে পুনর্বাসনের চেষ্টা প্রকৃত অর্থে একটি বিশ্বাসঘাতকতার আখ্যান। সিরিয়ার জনগণ মনে করছে, তাদের পিঠে ছুরিকাঘাত করছে এমন রাষ্ট্রগুলো, এক দশক আগেও যারা সংকটের সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে যে, সেই সমর্থন ছিল কেবল মুখরোচক বুলি ‘ফ্রেন্ডস অব সিরিয়া’ আদতে একটা প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। আরব লিগে পুনরায় সিরিয়ার অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে সিরিয়ার জনগণের সঙ্গে কি কোনো আলোচনা করা হয়েছে? হয়নি। ফলে অবশ্যই এর বৈধতা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।

ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতও সিরিয়াকে সিওপি-২৮ জলবায়ু সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অদ্ভুত বিষয়। এটা আসাদকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতির সম্মান দেবে মাত্র, উপস্থিত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা জলবায়ু সমস্যা নিরসনে তাকে দিয়ে কী-ইবা করাতে পারবে? সিরিয়ার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং কার্বন কমাতে রাষ্ট্রের কোনো কৌশলই এখানে কার্যকর নেই।

সিরিয়ার সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যেতে যা দরকার, তা হলো, আইনি জবাবদিহি। যারা যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিকল্প নেই। প্রয়োজন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজুল্যুশন ২২৫৪ বাস্তবায়ন করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আসাদকে সরকার থেকে সরে যেতে একটি ট্রানজিশন চালু করা। আরব লিগের এই দুর্ঘটনার পর সেই সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে অনেক দূর-অস্ত মনে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র কি সিরিয়া প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত? জনসমক্ষে তারা দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করে, কিন্তু নতুন করে যারা আসাদ সরকারের বৈধতা চায়, তাদের মুখ বন্ধ করতে বা তার মিত্রদের ওপর চাপ দিতে কোনো ভূমিকা নেই তার। অভিযোগ আছে, যুক্তরাষ্ট্র বরং নীরবে এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে।

বাইডেন প্রশাসন আজকাল মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে চীন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেশি আগ্রহী, সিরিয়া সম্পর্কে বেশিরভাগ ঘোষণা আসছে তাই মার্কিন কংগ্রেস থেকে। অথচ এই কংগ্রেসই একসময় ‘সিজার অ্যাক্ট’র মাধ্যমে সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনে ভোট দিয়েছে এবং কংগ্রেসনাল ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি সিরিয়ায় জবাবদিহি চাওয়ার জন্য একটি শুনানিরও আয়োজন করেছে। আরব লিগ যা করেছে তার প্রতিক্রিয়ায় আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে আইনপ্রণেতারা একটি বিলও উত্থাপন করেছেন। তারপরও আরব লিগের শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির উপস্থিতি আমেরিকার ইশারায় ছিল কি না এমন প্রশ্ন অমূলক না।

বাশার আল-আসাদের অধীনে সিরিয়ার শাসনের স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া আরব লিগের একটি রাজনৈতিক এবং নৈতিক ব্যর্থতা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নৈতিক কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়েছে। সিরিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে গত কয়েকদিন ছিল সবচেয়ে অন্ধকারতম দিন। ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি আসে না। তবে বিশ্বাস হারালে চলবে না যে, এটি শুধু একটি বিপত্তি। আসাদের শাসন প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ হলেও একদিন নিশ্চয় এর অবসান হবে, ন্যায়বিচার আসবে। শত সহস্র মৃত্যু বৃথা হতে পারে না। মার্টিন লুথার কিং যেমন বলেছিলেন, ‘নৈতিক মহাবিশ্বের চাপ দীর্ঘ বটে, তবে সেটি ন্যায়বিচারের দিকেই ঝুঁকছে।’

মিডিলইস্ট মনিটর থেকে ভাষান্তর করেছেন মনযূরুল হক

লেখক: সিরিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ইয়র্কশায়ারের মিডিয়া এবং অ্যাডভোকেসি অফিসার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত