অনিশ্চিত প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ৫২৮ কোটি টাকা

আপডেট : ২৯ মে ২০২৩, ১১:৪৮ পিএম

বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কারখানার বয়স ৮৫ বছরেরও বেশি। পুরনো এই কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২০১৬ সালে ৬৬৭ কোটি টাকা অনুমোদিত ব্যয়ে আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। কোম্পানিটির আধুনিকায়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম নির্ভর করবে ভারতীয় কাঁচামালের ওপর, যা রোপওয়ের মাধ্যমে আনা হবে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও রোপওয়ে স্থাপনের অনুমোদন মেলেনি। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ৫৯ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কাঁচামাল আমদানিতে রোপওয়ে স্থাপনে ভারতের অনুমোদন না পাওয়ায় দীর্ঘদিন থমকে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সিমেন্ট কোম্পানির উন্নয়নকাজ। এতে বিপাকে পড়েছে সিমেন্ট কারখানাটি। এ ছাড়া ঠিকাদারের অনিয়ম, কাজের ধীরগতিসহ বিভিন্ন কারণে এখনো কাটেনি প্রকল্পটি অনিশ্চয়তা।

এ প্রকল্পটি নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অস্বস্তিও রয়েছে। এমন অস্বস্তির মধ্যেই ডলারের দাম বাড়ার অজুহাতে ফের প্রকল্পটির ব্যয় ৫২৮ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৬৬৭ কোটি টাকা, পরে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়িয়ে টাকা ৮৯০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু তাতেও প্রকল্পটির কাজ শেষ না হওয়ায় এখন দ্বিতীয় সংশোধনীতে ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকার প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত এ ব্যয় প্রথম সংশোধনীর তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি।

ব্যয় বাড়ানোর কারণ হিসেবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) দাবি করেছে, প্রকল্পটির মূল কাজ ড্রাই প্রসেসের জন্য সমন্বিত সিমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য সাধারণ ঠিকাদার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয় নানজিং সি-হোপ সিমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড চায়না। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যখন চুক্তি হয় তখন ডলার রেট ছিল ৮৪ টাকা, কিন্তু এখন ডলার রেট বেড়ে ১০৬ টাকা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ঠিকাদারকে চারটি বিল ৯৫ থেকে ১১০ টাকা প্রতি ডলার হিসেবে শোধ করা হয়েছে। এ ঠিকাদার তার চুক্তিমূল্যের ৪৩ শতাংশ ইতিমধ্যে পেয়েও গিয়েছেন।

এ সংশোধনীতে ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় বাড়ছে প্রকৌশল খাতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে। প্রকৌশল ও অন্য সরঞ্জামাদির খাতে ৫৩৯ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

শুধু তা-ই নয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যখন চুক্তি হয়, তখন ডলারের রেট ছিল ৮১ টাকা ৭৫ পয়সা। ইতিমধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকেও চুক্তিমূল্যের ২৯ শতাংশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

এ প্রকল্পের একটি বড় বাধা ছিল রোপওয়ে স্থাপনের জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়া। তবে সংশোধনী প্রস্তাবে তারা জানিয়েছে রোপওয়ে স্থাপনে ভারতীয় অংশের অনুমোদন পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন পেলে সে অনুযায়ী সাধারণ ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে।

মেয়াদ কেন বাড়ানো হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্পশক্তি বিভাগের সদস্য ও সচিব আবদুল বাকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প দেরি হওয়ার কারণে সরকারের অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। ডলারের দাম বাড়া ও বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ায় এ প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর নিয়ে বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা হয়েছে। এতে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন খোদ শিল্প প্রতিমন্ত্রী। ছাতক সিমেন্টের প্রকল্পটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী মালামাল ও মেশিনারিজ সরবরাহ করেনি। আবার যে মালামাল সরবরাহ করেছে তা খুবই নিম্নমানের। ঠিকাদারের বিল পরিশোধের আগে এ বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যেসব খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে : আপ্যায়ন খাতে ৬৬ লাখ, নিরাপত্তায় ৩৮ লাখ, সম্মানী বাবদ ৪৮ লাখ, অপ্রত্যাশিত ব্যয় ৪২ লাখ, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে ২২ লাখ, মনিহারি খাতে ১৭ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব খাতের ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা কি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

এ ছাড়া ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু অযৌক্তিক দাবিও তুলেছে বিসিসিআইসি। যেমন : লাইসেন্স ফি বাবদ ১৯ লাখ ধরা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন দাবি করেছে, লাইসেন্স ফি, নিবন্ধন ফি এবং টেস্টিং ফির প্রয়োজনীয়তা কী?

ব্যাংক চার্জ খাতে ১৭ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। ব্যাংক চার্জের কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

শুধু তা-ই নয়, ১০ জনের নিরাপত্তার ব্যয় ৩৮ লাখ টাকা বাড়ানোর যৌক্তিকতারও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিসিআইসি। এ ছাড়া তিন মাসের কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশের জন্য ৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। এ ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।

পুরনো এই কারখানাটির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৫০০ থেকে ২০০ টনে নেমে আসায় সরকার ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। এটির কাজ পায় চীনের ঠিকাদারি কোম্পানি নাং জি সি হোপ। তারা ২০১৯ থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের কাজ শুরু করে। নতুন প্ল্যান্ট চালু হলে প্রতিদিন দেড় হাজার টন ক্লিংকার ও ৫০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন আনার জন্য ‘ছাতক সিমেন্ট কারখানা লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেস এ রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৬ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর এর অনুমোদন দেয় একনেক। ২০১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রশাসনিক অনুমোদন জারি করা হয়।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্যমান পুরনো ও অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনক্ষম ওয়েট প্রসেস পদ্ধতির পরিবর্তে ড্রাই প্রসেসের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ টন (বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন) উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন কারখানা স্থাপন করা। নির্মাণাধীন এই মূল প্ল্যান্টের চুনাপাথর আমদানির জন্য দৈনিক আড়াই হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ১৭ কিলোমিটারের রোপওয়ে স্থাপন করতে হবে, যেটি মেঘালয় থেকে ছাতক কারখানা পর্যন্ত স্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার শুরুতে স্থানীয় উত্তোলন কেন্দ্র থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করলেও পরবর্তী সময়ে কাঁচামাল আমদানিতে ভারতের মেঘালয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কোম্পানিটি। চুনাপাথর আমদানি ও পরিবহনের জন্য ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কমোররা লেমিসটোন মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (কেএলএমসি) সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি করে ছাতক সিমেন্ট, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩৩ সালে। কিন্তু নির্মাণাধীন মূল প্ল্যান্টের জন্য চুনাপাথর আমদানি ও পরিবহনে ভারতীয় অংশে নতুন রোপওয়ে স্থাপনের জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তাই কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত