সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এখন আলোচনায় ভোটসংখ্যা যোগ-বিয়োগের সমীকরণ। ভোটের পাল্লা ভারী করতে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ব্যস্ত নানা তৎপরতায়। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলছে ভোটারের মন জয়ের চেষ্টা। আছে নানা কৌশলও।
সিসিকের বর্তমান মেয়র বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী তার দলের সিদ্ধান্ত মেনে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরপর দুটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র হয়েছেন আরিফুল। বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থক ছাড়াও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই এবারের নির্বাচনেও তাকে বিবেচনা করা হচ্ছিল শক্ত প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থী না হওয়ায় তার ভোটব্যাংকে নজর পড়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থীদের। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল মেয়র আরিফের ভোটব্যাংকে ভাগ বসাতে চান। এজন্য তৎপর তারা উভয়েই। গত রবিবার সকালে মেয়র আরিফুলের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় তিনি আরিফুলের দোয়া ও নির্বাচনে সমর্থন প্রত্যাশা করেন। ওইদিনই মধ্যরাতে মেয়র আরিফের বাসায় ছুটে যান জাপার প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুলও। তিনিও একইভাবে আরিফের সমর্থন চান। মেয়র পদের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর এভাবে বর্তমান মেয়রের বাসায় গিয়ে বৈঠকের বিষয়টি এখন সিলেটে বেশ আলোচিত। অনেকে বলছেন, আরিফুল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও নির্বাচনে যে তার প্রভাব রয়েছে তা স্পষ্ট। তাই তার প্রভাবকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা। অবশ্য আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আরিফুলের সঙ্গে খাতির জমিয়ে তার সমর্থকদের ভোট পাওয়ার আশাদুরাশায় পরিণত হবে। কারণ আরিফুল যেদিন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দেন, ওইদিনই তিনি নির্বাচন বর্জনেরও ডাক দিয়েছেন। এবারের নির্বাচনকে প্রহসন উল্লেখ করে আরিফুল সেদিন বলেছিলেন, ‘প্রহসনের নির্বাচন আমি বর্জন করলাম, আপনারাও করুন, দয়া করে কেউ ভোট দিতে যাবেন না।’
নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বলছেন, আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় মেয়র পদে নির্বাচনের আমেজ কমে গেছে। তবে ৪২টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদের ভোটে জমজমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ওয়ার্ডে বিএনপির প্রার্থীও রয়েছেন। তাই কাউন্সিলর প্রার্থীরাই যার যার ওয়ার্ডে ভোটার উপস্থিতি বাড়াবেন বলে মনে করা হচ্ছে। আর ভোটকেন্দ্রে যারা যাবেন, তাদের মধ্যে আরিফুল সমর্থকরা মেয়র পদে কাকে ভোট দেন সেটা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। অনেকেই মনে করছেন, আরিফুল সমর্থকদের ভোট ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বাক্সে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর এখানেই আশা দেখছেন জাপা প্রার্থী ও তার সমর্থকরা। আরিফুলবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামানের সঙ্গে জাপা প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন বলে আশা করছেন জাপা নেতাকর্মীরা। সদ্য সমাপ্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে জাপার অনেকে বলছেন, গাজীপুরে একজন বয়োবৃদ্ধ গৃহিণীর কাছে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা কারণে সাধারণ ভোটাররা এখন নৌকার বিপক্ষে।
গাজীপুরের ফল দেখে সিলেট আওয়ামী লীগের কপালেও এখন চিন্তার ভাঁজ। আরিফুল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন তাদের প্রার্থী সহজেই জিতে যাবেন। কিন্তু গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ফল তাদের ভাবনা পাল্টে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে সিলেট আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ফল দেখে তারা মোটেও আতঙ্কিত নন, তবে অনেক বেশি সতর্ক হয়েছেন। দলের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। দল ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবং সিলেটের শীর্ষ নেতারা বিশ্বাসঘাতকতা না করলে নৌকার প্রার্থীকে কেউ হারাতে পারবে না।
মেয়র আরিফুলের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জাপার মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ। এর বেশি কিছু নয়। তবে নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়েছে, আমি তার দোয়া ও সমর্থন চেয়েছি।’
একই বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আরিফুল হক দশ বছর ধরে সিলেট সিটির মেয়র। এবার তিনি প্রার্থী হননি। তিনি প্রার্থী হলে নির্বাচন আরও বেশি উৎসবমুখর হতো। কুশলবিনিময়ের জন্যই তার বাসায় গিয়েছিলাম। তিনিও অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আতিথেয়তা করেছেন। এটাই আমাদের সামাজিক-পারিবারিক সম্পর্কের সৌন্দর্য। এই সম্প্রীতি খুবই জরুরি।’
আনোয়ার ও বাবুলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ : মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুলকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল মঙ্গলবার সিলেট সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ফয়সল কাদের স্বাক্ষরিত আলাদা দুটি চিঠিতে তাদের কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রতীক বরাদ্দের আগেই তারা প্রচারপত্র বিতরণ ও গণসংযোগ করেছেন।
