স্মার্ট বাজেটে আনস্মার্ট মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

আপডেট : ০১ জুন ২০২৩, ১০:২১ পিএম

বাজেটের একটা দর্শন থাকে। রাষ্ট্র আয় করবে কোথা থেকে আর ব্যয় করবে কার জন্য তা নির্ধারিত হয় একটি দর্শন দ্বারা। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতি বছর বাজেটের নানা ধরনের নামকরণ করা হয়ে থাকে। যেমন বাজেট ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে এই প্রতিপাদ্যে সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণকেই বলা হচ্ছে এবারের বাজেটের মূল দর্শন। বলা হয়েছে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে যার স্তম্ভ হবে চারটি। স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট সোসাইটি ও স্মার্ট ইকোনমি। বলা হয়েছে স্মার্ট বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ডলার, দারিদ্রসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশ মানুষ, চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়, মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে, বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে, রাজস্ব জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের ওপরে, বিনিয়োগ হবে জিডিপির ৪০ শতাংশ।

দেশের ইতিহাসের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ২৪তম বার্ষিক আয়-ব্যয় বিবরণী বা বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে জাতীয় সংসদে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে স্বাধীনতার পর দেশের বয়স যত বাড়ছে, বাজেটের আকার তত বড় হচ্ছে। এবারের বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৫ শতাংশ। এই পরিমাণ টাকা আসবে কোথা থেকে? বাজেটে ৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয় আসবে বলে সরকার ধরে নিচ্ছে। এ আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে  ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫.২ শতাংশ। কিন্তু ঘাটতি বাজেট হলেও সরকারকে খরচ তো করতেই হবে। তাই উপায় হিসেবে বলা হয়েছে, ঘাটতি পূরণ (অর্থসংস্থান) করা হবে দুইভাবে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ নিয়ে। বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হবে নিট ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, আর সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ নেওয়া হবে ২৩ হাজার কোটি টাকা। 

ঘাটতি পূরণে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ তো প্রতি বছরই করতে হয়। কিন্তু এই ঋণ কতটুকু নেওয়ার পরিকল্পনা এবং কত নেওয়া হয় তার মধ্যে বেশ বড় ফারাক থেকে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। গত এপ্রিলে এসে দেখা গেল প্রয়োজন আরও বেশি। ফলে ব্যাংকঋণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা যা বর্তমান অর্থবছরের ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার তুলনায় ২৬ হাজার কোটি বা ২৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে ঘাটতি পূরণ হয়তো হবে কিন্তু  মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দেবে।   

যে বছরটা পেরিয়ে এলাম আমরা অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। নানা কারণে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটের আকারকে ভিত্তি ধরলে আগামী বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু আয় বৃদ্ধির যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে তা সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে সেই আলোচনাটা খুবই জরুরি। আয় বৃদ্ধির প্রধান উৎস এনবিআর। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৩৪ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হলেও গত জুলাই-এপ্রিল সময়ে সব মিলিয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার ২৮২ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। ফলে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, আয়বৈষম্য রোধ করা এবং রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করা এগুলো এবারের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কী সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, বাজেটে সেটাই দেখার বিষয়। 

দেশের অর্থনীতি এখন নানামুখী চাপে বিপর্যস্ত। ডলারের সংকট এখনো প্রকট। পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে গেলে কোনো কোনো ব্যাংক ফিরিয়ে দিচ্ছে। আবার রপ্তানি আয় তুলতে গেলেও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি দেশে সাম্প্রতিক অতীতের বছরগুলোতে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ দেখেছে বছর জুড়ে চাল, ডাল, লবণ, ভোজ্য তেল, চিনিসহ প্রায় প্রতিটি জিনিসেরই দাম বেড়েই চলেছে। সরকার মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল ৫.৬ শতাংশ কিন্তু গত এপ্রিলে তা ছিল ৯.২৪ শতাংশ। অথচ মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.২৩ শতাংশ। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। কমেছে টাকার মান। প্রায় ৩০ টাকা কমেছে ডলারপ্রতি। প্রণোদনা দিয়েও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বাড়ানো যায়নি, রপ্তানি আয়ের প্রবণতাও ছিল নিম্নমুখী। ডলার সংকটে বিলাসপণ্যের আমদানি সংকোচনের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যাচ্ছে  গত জুন থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ৫৬ শতাংশ, আর মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ৩১ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি যেমন, তেমনি দাম বাড়ানো হলেও শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটের সুরাহা হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নানা ধরনের শর্ত পূরণের চাপ। আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার চেয়ে সরকার প্রথম কিস্তি পেয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তি পেতে সময় লাগবে আগামী ডিসেম্বর। সে ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পূরণ করতে পারলেই পাওয়া যাবে পরবর্তী কিস্তি। রিজার্ভ সংরক্ষণসহ বড় কিছু শর্ত পূরণ না হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। 

এখন দেখা যাক গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো কেমন গুরুত্ব পেল এবারের বাজেটে? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা যা গত বাজেটে ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। সেই ৫ শতাংশের ঘরেই থেকে গেল স্বাস্থ্য বাজেট। করোনার আঘাত, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়ের ৭২ শতাংশ জনগণের নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করার তথ্য জানা থাকার পরও স্বাস্থ্য খাতে কিন্তু বরাদ্দ বাড়ল না উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ৩৪ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যা গত বাজেটে ছিল ৩১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতে ৪২ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যা গত অর্থবছরে ছিল ৩৯ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১০ হাজার ৬০২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, যা গত বছরে ছিল ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দাঁড়াল ১১.৫৮ শতাংশ। যা ছাত্রসমাজের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা আর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হলো কি? যে কৃষি দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের প্রধান খাত সেই খাতে বরাদ্দের পরিমাণটাও দেখা যাক। কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা যা গত বছরে ৩৩ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। মোট বাজেটের ৪.৬৪ শতাংশ। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে এত উদ্বেগ সত্ত্বেও কৃষি খাতে বরাদ্দ কি প্রয়োজন পূরণের মতো হয়েছে, সে প্রশ্ন করাই যায়।

প্রতি বছর শ্রম বাজারে আগত ২০ লাখ কর্মপ্রত্যাশীদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে উদ্বেগ যত আছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী দক্ষতার ঘাটতি যত উদ্বেগ তৈরি করেছে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটের বরাদ্দ তেমন দৃশ্যমান নয়। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দক্ষতা ও  কর্মসংস্থানের যে সুযোগ তৈরির কথা বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ হয়েছে তা খুব বেশি আশা জাগায় না। ১৭৬টি দেশে ১ কোটি ৪৯ লাখের অধিক কর্মী কর্মরত। কিন্তু এদের মধ্যে অধিকাংশই আধা দক্ষ, অদক্ষ; ফলে দক্ষতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বাজেটে দেশে এবং বিদেশে কর্মপ্রত্যাশীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও বরাদ্দের ক্ষেত্রে তার ছাপ লক্ষ করা গেল না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশের সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার ঘটনা লক্ষ করা গেলেও বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রতিফলন সংগতিপূর্ণ নয়। ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব গত বছরের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যাক। গত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। বাজেট যত বড়, বরাদ্দ তত গুরুত্ব পায়নি।

বাজেটে আয় বৃদ্ধির যে সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ব্যয় বরাদ্দের যে সব ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে, জনগণের ওপর ভ্যাট ট্যাক্সের পরিমাণ বৃদ্ধির যে সমস্ত পরিকল্পনা উল্লেখ করা  হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।  জনজীবনকে সহনীয় রাখার জন্য জনগণের টাকায় জনগণের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা কেমন থাকবে, বৈষম্য কমানোর পদক্ষেপ কী হবে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি আর আয় বৈষম্য বৃদ্ধি যে সমানতালেই চলছে তা কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে কি না, বাজেটের পরে সেটাই হবে জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত