প্রায় ছয় বছর বন্ধ থাকার পর জাপানি বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। জাপানি প্রতিষ্ঠান মিনোরি বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে উৎপাদনে ফেরে মৃতপ্রায় এমারেল্ড। আর স্বল্প সময়ের উৎপাদন দিয়েই গত বৃহস্পতিবার কোম্পানিটি ২০২১-২২ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। শুধু তাই নয়, উৎপাদিত রাইস ব্র্যান অয়েল বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিয়া মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ দেখা। এরই অংশ হিসেবে স্বল্প সময়ের উৎপাদন দিয়ে আমরা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছি, যাতে ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে বের করে আনা যায়। এখন লক্ষ্য হচ্ছে ভালো লভ্যাংশ দিয়ে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা।
মিয়া মামুন আরও বলেন, মূলত এমারেল্ডের তেল জাপানে রপ্তানির উদ্দেশ্যেই আমরা কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছি। একটি রুগ্ণ কোম্পানিকে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি চেয়ারম্যানের সহায়তায় এখন আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি জাপানে রপ্তানির জন্য। আগামী ২/৩ মাসের মধ্যেই এটি সম্ভব হবে বলে মনে করছি। কিছু কমপ্লায়েন্স ইস্যু ছিল, যা আসন্ন এজিএমে সমাধান হয়ে যাবে। এরপর তেল রপ্তানিতে আর কোনো বাধা থাকবে না।
গত ১ জুন এমারেল্ড অয়েলের পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। কোম্পানিটির আগের উদ্যোক্তা বাদে অন্য সবাই এ লভ্যাংশ পাবেন। ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে দীর্ঘদিন বিদেশে পলাতক থাকায় আগের উদ্যোক্তাদের সব শেয়ার ফ্রিজ করা আছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল কোম্পানিটির তৎকালীন পর্ষদ। রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় কোম্পানিটির প্রধান উদ্যোক্তা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এমারেল্ড অয়েলের।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেষ্টায় ২০২১ সালে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। বন্ধ থাকা কোম্পানিটিতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে জাপান-বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড। মিনোরির নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে ফেরে এমারেল্ড অয়েল। কোম্পানিটির রাইস ব্র্যান তেলের দুটি ইউনিটের একটি সচল রয়েছে, যেখান থেকে এখন প্রতিদিন প্রায় ৪৫ টন ক্রুড অয়েল উৎপাদন হচ্ছে। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমারেল্ডে প্রাণ ফিরিয়ে আনে মিনোরি। কোম্পানিটি উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের সহায়তা দেন এসইসি চেয়ারম্যান।
এ বিষয়ে এসইসি চেয়ারম্যান ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু এমারেল্ড নয় সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, রিং সাইন টেক্সটাইলসহ প্রায় ২০টির মতো পুরনো বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানি আমরা পুনর্গঠিত করেছি। এরমধ্যে অনেকগুলো কোম্পানি নতুন ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনে ফিরেছে। পুরনো বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানিগুলো সচলে আমাদের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরও প্রায় ২০টি কোম্পানি উৎপাদনে ফিরবে। এখন বড় বড় গ্রুপগুলো পুরনো বন্ধ থাকা এসব কোম্পানি নিতে চাইছে। কারণ নতুন করে জমি, যন্ত্রপাতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগসহ পুরো প্রক্রিয়া শেষে উৎপাদন শুরু করতে অনেক সময় ও অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু পুরনো কোম্পানি ছয় মাসের মধ্যে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়।
এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পুরনো কোম্পানিগুলো বন্ধ থাকায় দেশের সম্পদ নষ্ট হচ্ছিল। মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের মাধ্যমে সেসব কোম্পানি এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনে ফিরছে, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিচ্ছে, কর্মসংস্থান হচ্ছে। এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এদিকে দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছিল না এমারেল্ড অয়েল। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন সংকট কাটাতে গত ১১ মে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রাইস হাস্ক (ধানের তুষ) বয়লার সংযোজন করেছে কোম্পানিটি। এর ফলে এখন থেকে টানা ২৪ ঘণ্টা ধানের কুড়ার তেল উৎপাদন করতে পারবে এমারেল্ড অয়েল। এর ফলে প্রতিদিন অন্তত ২০০ টন রাইস ব্র্যান ক্রাশিং করা যাবে, যা থেকে ৪০-৪৫ টন তেল পাওয়া যাবে। বয়লার স্থাপনের কারণে পরিশোধিত তেল উৎপাদন সর্বোচ্চ ৭০ টনে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফজাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি কোম্পানি এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদন চালাচ্ছে। মুনাফাও হচ্ছে। প্রথম বছরের স্বল্প উৎপাদন থেকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি ২৪ ঘণ্টা সচল রাখার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাঁচামাল, জ্বালানি থেকে সবকিছু অনুকূলে থাকায় এটি এখন আমাদের আরও বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
এদিকে নতুন বিনিয়োগের বিপরীতে গত ১০ এপ্রিল এমারেল্ড অয়েলের আরও ৩ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার নতুন শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে এসইসি, যা মিনোরি বাংলাদেশের নামে ইস্যু করা হবে। এর আগে বাজার থেকে এমারেল্ড অয়েলের ৪৬ লাখ শেয়ার কেনে মিনোরি বাংলাদেশ। নতুন শেয়ার বরাদ্দ হলে এমারেল্ড অয়েলের পরিশোধিত মূলধন ৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকায় উন্নীত হবে।
এমারেল্ড অয়েলকে সফলভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার পর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তালিকাভুক্ত আরেক কোম্পানি ফু-ওয়াং ফুডসের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা তুলে দেওয়া হয় মিনোরির হাতে। এটিরও ধারাবাহিক উন্নতি দেখা গেছে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি ও মুনাফা বাড়ছে।
