ঢাকায় বায়ুদূষণে পরিবহন শীর্ষে

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ০৫:৪৭ এএম

ঢাকায় ৫০ ভাগ বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে পরিবহন খাত। এমন তথ্য জানিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) বলছে, নিম্নমানের জ্বালানি তেল ছাড়াও এ দূষণের জন্য দায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, প্রাইভেট কারের আধিক্য, লক্কড়-ঝক্কড় বাস, ট্রাক এবং অন্যান্য যানবাহন। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ধুলাদূষণ; উন্নয়ন কাজে সৃষ্টি ধুলায় বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে প্রায় ২০ ভাগ। আর ঢাকার আশপাশের ইটভাটার দূষণ ঘটাচ্ছে ২০ ভাগ। এ ছাড়া শিল্প-কলকারখানা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বর্জ্যদূষণ ঘটাচ্ছে প্রায় ১০ ভাগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতে দূষণের মাত্রাও কমবেশি হয়ে থাকে। ইটভাটার দূষণ শীতকালে মাত্রা ছাড়ায়। উন্নয়নজনিত কারণে ধুলাবালুর দূষণও শুষ্ক মৌসুমে বেশি থাকে। শিল্প-কলকারখানার দূষণ খুব বেশি ওঠানামা করে না। তবে সারা বছরের হিসাবে ঢাকায় বায়ুদূষণে পরিবহন খাতের দায় বেশি। বর্ষার মৌসুমে উন্নয়নকাজের সৃষ্ট ধুলা ও ইটভাটার দূষণের পরিমাণ খুবই নিচে নেমে আসে। বছরের বেশিরভাগ সময় বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার পরিবেশগত মান খুবই নাজুক থাকে। এজন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা-এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআই) জরিপে প্রায়ই ঢাকার বায়ুমান দূষিত বিবেচনায় শীর্ষে থাকে।

জানতে চাইলে পবার চেয়ারম্যান আবু নাছের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার বায়ুদূষণে বেশ কয়েকটি কারণ বড় মাত্রায় দায়ী। এর মধ্যে অন্যতম পরিবহন খাত; বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি। একটি বড় বাসে ১০০ জন যাত্রী চলাচল করতে পারে। সেই পরিমাণ যাত্রী চলাচলে অন্তত ৮০ থেকে ৯০টি প্রাইভেট কার ব্যবহার করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহনের মান খারাপ হওয়ায় মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এখন ঢাকায় গণপরিবহনের চেয়ে প্রাইভেট কারের পরিমাণ বেড়েছে। আর আমাদের দেশে গাড়ির ইঞ্জিনের পরিবেশগত মান ২ থেকে ৩। উন্নত দেশের গাড়ির ইঞ্জিনের মান ৪ থেকে ৫। কোনো কোনো দেশ এর চেয়েও উন্নতমানের ইঞ্জিন ব্যবহার করতে শুরু করেছে। জ্বালানির মান ভালো না হওয়ায় উন্নতমানের পরিবেশ মানসম্মত ইঞ্জিন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।’

আবু নাছের খান আরও বলেন, ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ যানবাহনও পরিবেশ দূষণের জন্য অনেক ভূমিকা রাখছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর এ ব্যাপারে দায় থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বিকার রয়েছে। কখনো লোক দেখানো অভিযান চালালেও তাতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না।’

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘ঢাকার বায়ুদূষণের পরিবহন খাতের অনেক দায় রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানিতে বেশি সালফারের ব্যবহার করা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ডিজেলে সালফারের ব্যবহার ৫০ পিপিএম থেকে ২৫০ পিপিএম পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এটা করে ডিজেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে চেষ্টা চালিয়েছে সরকার। এটা মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটিয়েছে। দেশের পরিবেশগত মানদন্ড অনুযায়ী ডিজেলে সালফারের পরিমাণ ৫০ পিপিএমের বেশি ব্যবহার করা যায় না। সরকার এ ক্ষেত্রে পরিবেশের নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে।’

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুস সোবহানও বলেন, ‘ঢাকার পরিবেশ দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী পরিবহন খাত, উন্নয়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজ, যত্রতত্র বর্জ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘পরিবহন খাতের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ নিম্নমানের জ্বালানির ব্যবহার। পরিবেশগত বাধা থাকলেও সব সংস্থা এ ক্ষেত্রে সম্মতি দিয়েছে বলে জানতে পেরেছি।’

আবদুস সোবহান আরও বলেন, ‘ঢাকার ধুলাদূষণ বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভূমিকা রাখছে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, পিডিবি, ডিপিডিসি ও ডেসকো।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একসময় দেশের ডিজেলে সালফারের ব্যবহার ছিল ৫০০ পিপিএম। সেখান থেকে কমিয়ে ৫০ পিপিএমে আনা হয়। তবে সেখান থেকে সরে আসতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ এমন মানদন্ডে ডিজেল ব্যবহার করে। তবে উন্নত দেশগুলো ডিজেলের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোল ও অকটেনের ব্যবহার থেকেও তারা সরে এসে বৈদ্যুতিক ব্যবহার শুরু করেছে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেকানিক্যাল বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের আমদানিকৃত জ্বালানি অনেকটা নিম্নমানের। এজন্য পরিবেশগত উন্নতমানের ইঞ্জিন ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানির মান উন্নয়ন ঘটালে যেকোনো সময় উন্নত মানসম্মত ইঞ্জিন নিয়ে আসা যাবে। তখন জ্বালানিজনিত বায়ুদূষণ বা পরিবহন খাতের বায়ুদূষণের মান অনেকাংশে হ্রাস পাবে।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) খালিদ আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আমদানি করা ডিজেলে সালফারের পরিমাণ ৫০ পিপিএম নির্ধারিত। তবে কখনো কখনো আমদানি ডিজেলে সালফারের পরিমাণ বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে দেশে আনার পর সেটাকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়।’

ঢাকার দুই মেয়রের অভিমত : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ঢাকার বায়ুর মান খারাপ; এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। আন্তর্জাতিক হিসাবে প্রায়ই ঢাকা শহর দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। এটা খুবই দুঃখজনক ও কষ্টকর অভিজ্ঞতা।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বায়ুদূষণে প্রায় ৭০ শতাংশ দায়ী পরিবহন খাত। কেননা ঢাকায় চলাচল করা যানবাহনের জ্বালানির মান পরিবেশের জন্য সহায়ক নয়। এটার জন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা দায়ী নয়। এখানে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার যে মানের জ্বালানি ব্যবহার করছে, তা নিম্নমানের। এ ক্ষেত্রে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ধুলাবালু নিবারণে ডিএনসিসি অত্যাধুনিক স্প্রে ক্যাননের মাধ্যমে পানি ছিটায়। পাশাপাশি ঢাকায় মেগাপ্রকল্প, বিআরটি, এক্সপ্রেসওয়েসহ চলমান অন্যান্য প্রকল্পকে ধুলাদূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সংস্থাগুলোকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত