পোশাকশিল্পে বিশ্বের শীর্ষ গ্রিন কারখানা এখন বাংলাদেশে। একসময় পোশাক-কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কিংবা কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রাখতে ঠিকই এগিয়ে গেছে দেশের পোশাকশিল্প। পোশাকশিল্পের সেই প্রভাব এখন দেশের অন্য শিল্প-কারখানাগুলোতেও পড়তে শুরু করছে। এখন গ্রিন সার্টিফিকেটসহ নানা সূচকে উন্নতি করার ক্ষেত্রে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোও অগ্রগামী।
তবে এই অগ্রগামিতার পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন কিংবা মাঠপর্যায়ে এর তদারকির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সূচকগুলোও নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সূচকের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষের ধ্যানধারণা অনেক বদলে গেছে। শিল্প-কারখানাগুলোতে নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করা হচ্ছে। এতে পরিবেশসম্মত শিল্প-কারখানার সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। যারা এর বাইরে রয়েছে তাদের এনফোর্সমেন্টের (আইন বলবৎ) আওতায় এনে জরিমানাও করা হচ্ছে।’
কারখানাগুলো পরিবেশসম্মত করে গড়ে তোলা ছাড়া উপায় নেই বলে জানান দেশে গ্রিন শিপইয়ার্ড তৈরির কারিগর পিএইচপি শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম রিংকু। তিনি বলেন, ‘বিশ^বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে আন্তর্জাতিক সূচকগুলোর পাশাপাশি শতভাগ পরিবেশ সহায়ক কারখানা গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তরল বর্জ্যদূষণের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে ডাইং কারখানাগুলো, বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে স্টিল মিলস ও কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। এ ছাড়া ইটভাটা, সিমেন্ট কারখানার পাশাপাশি রয়েছে শিপইয়ার্ডগুলো। তরল বর্জ্যদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ইটিপি (তরল বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর নেই। অনেক কারখানা ইটিপি স্থাপন করলেও তা সচল না রেখেই অন্যপথে তরল বর্জ্য বের করে দেয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট টিমের বিভিন্ন সময়ের অভিযানে এমন সত্যতা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও একই চিত্র। দূষণ নিয়ন্ত্রণে শিল্প-কারখানাগুলো বায়ু পরিশোধন প্ল্যান্ট বসালেও তা সচল রাখতে খরচ বেশি প্রয়োজন হয় বলে বন্ধ রাখে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, ‘শিল্প-কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে এনফোর্সমেন্ট চালানো হয়। তখন তাদের মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, অনেক শিল্প-কারখানা ইটিপি চালু রাখে এবং বায়ু পরিশোধন করে বাতাসে দূষণমুক্ত বাতাস ছাড়ে। এ ক্ষেত্রে বিএসআরএম, আবুল খায়ের স্টিল, জিপিএইচ স্টিল অন্যতম। অন্যদিকে রেকিট বেনকিজার (বাংলাদেশ) লিমিটেড দৃষ্টান্ত রাখছে।
ফেরদৌস আনোয়ার আরও বলেন, দেশে এখন পরিবেশ উপযোগী ইট তৈরি হচ্ছে। একসময় পোড়া ইট উৎপাদিত হতো। আইনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। এখন তৈরি হচ্ছে ব্লক। সরকারি সব প্রকল্পে ব্লক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে ২০২৫ সাল থেকে। হলো ব্লক, কংক্রিট ব্লক তৈরি হচ্ছে বালু, নুড়িপাথর ও সিমেন্ট দিয়ে। ফলে ২০২৫ সালের পর ইটভাটা প্রায় থাকবে না বললেই চলে।’
পরিবেশসম্মত ইট প্রস্তুতে এগিয়ে আসার কথা উল্লেখ করে ফখরিজ গ্রিন বিল্ডিং রিসোর্সেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোছাইনি তাহের ফখরী বলেন, ‘বিশে^র কোথাও পোড়ানো ইট ব্যবহৃত হয় না। তাহলে তা আমাদের দেশে কেন হবে না? সেই চিন্তা থেকে আমরাও পরিবেশসম্মত ইট প্রস্তুতে এগিয়ে আসি। বাজারে খুব চাহিদাও রয়েছে। এ ছাড়া দেশের মেগা প্রকল্প ও শিল্প-কারখানাগুলোতে পেভমেন্টের (ফ্লোরে ইটের পরিবর্তে ব্যবহৃত ব্লক) চাহিদা খুব বেশি। এই পদ্ধতিতে আমাদের কৃষিজমি ও পাহাড়গুলো যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি পরিবেশও রক্ষা পাবে।’
তিনি আরও বলেন, পরিবেশসম্মত এসব ব্লক ব্যবহার যেমন টেকসই, তেমনিভাবে ‘হলো ব্লক’র ভেতরে খালি থাকায় ভবনের ওজনও ৪৫ শতাংশ কমে যায়।
শিল্প-কারখানাকে পরিবেশ উপযোগী গড়ে তোলা প্রসঙ্গে কথা হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কারখানাগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশের শর্তাবলি মেনে চলে। আর সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিয়ে থাকে। তবে সব কারখানার কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য এক নয়। গার্মেন্টসের সঙ্গে অন্য শিল্প-কারখানাগুলোকে তুলনা করলে হবে না।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মাঠপর্যায়ে প্রায় সব কারখানাকে পরিবেশ আইন মেনে কারখানা পরিচালনার জন্য শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সেই অনুযায়ী হচ্ছে কি না তা তদারকিও করা হয়। আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারখানা প্রতিনিধি জানান, প্রতিনিয়ত পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এসে বলে যাচ্ছেন। তাদের গাইডলাইন না মানলে জরিমানা করা হচ্ছে।