কালো ধোঁয়া থামাতে পারছে না কেউ

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ০৫:৪৯ এএম

ঢাকার সাভার থেকে ছেড়ে আসা লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাস রাজধানীর ইস্কাটন রোডে পৌঁছায় দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে। ঢাকা মেট্রো-ব ১৫৬৫০৮ নম্বরের এই বাস ইস্কাটন থেকে যাত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার দিকে চলে যায়। বাংলা মোটর থেকে মৌচাক মোড় পর্যন্ত অনুসরণ করে দেখা যায়, গতি বাড়ানোর সঙ্গে বিকট শব্দে ঘন-কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে বাসটি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সড়কে পথচারী ও অন্য পরিবহনগুলোতে থাকা যাত্রীরা নাক-মুখ চেপে ধরছেন, বিরক্তিও প্রকাশ করছেন। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের সামনে দিয়ে গেলেও ভ্রুক্ষেপ করলেন না তারা।

লাব্বাইক পরিবহনের এই বাসটি মৌচাক পৌঁছানোর পর চালকের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। চালক আল আমিন বলেন, ‘যানজটের কারণে দেরিতে আসায় একসঙ্গে অনেক যাত্রী উঠেছেন। এজন্য ওভারলোড হয়ে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।’

এভাবে রাজধানীর সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কালো ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন, যার অধিকাংশই বাস। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হলে তা জরিমানাসহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কালো ধোঁয়া বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম চোখে পড়ে না। ফলে ক্রমেই রাজধানীর প্রাণ-প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

গতকাল রবিবার লাব্বাইক পরিবহনের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই রুটে এখন তাদের প্রায় ৬০টি বাস চলছে। খরচ বাঁচাতে অধিকাংশ বাসেই ব্যবহার করা হয় পুরনো ইঞ্জিন অয়েল। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের পর তা পরিবর্তন না করায় ইঞ্জিনের পিস্টন নষ্ট হয়ে কালো ধোঁয়া ছড়ায়।

জানতে চাইলে পরিবহনটির রোড ইনচার্জ মো. শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু বাসের ইঞ্জিনে সমস্যা আছে। আমরা সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি।’

এই পথে নিয়মিত যাতায়াত করেন জামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কিছু সময় এসব বাসের ধোঁয়ায় তাকানো যায় না, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলো থেকে বেশি ধোঁয়া বের হয়।’

মগবাজার এলাকার মাহমুদা রহমান বলছিলেন, ‘আগের চেয়ে এখন আরও বেশি কালো ধোঁয়া দেখা যায়। বাস ছাড়াও ট্রাক ও অন্য গাড়ি থেকেও বের হয়। ফুটপাতে হাঁটতে গেলে ধোঁয়ায় বমি চলে আসে। শিশুরা এই ধোঁয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় দিন দিন তা বেড়েই চলছে।’

এর আগে ইস্কাটনে প্রায় আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে চারটি পরিবহনের ছয়টি বাসকে মগবাজারের দিকে যেতে দেখা যায়। এর মধ্যে চারটিই ঘন-কালো ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে গেছে। এরই মধ্যে লাব্বাইক ও স্বাধীন পরিবহনের বাসই বেশি।

এভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, বাস ছাড়াও মালবাহী পিকআপ ভ্যান, লেগুনা ও ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল থেকেও বের হচ্ছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অধীনে থাকা গাড়ি থেকেও কালো ধোঁয়া বের হওয়া ছিল চোখে পড়ার মতো।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তুলনামূলক বাসগুলোর এক-তৃতীয়াংশই ফিটনেস মেনটেইন করে না, ফলে এসব বাস থেকে প্রতিনিয়তই ব্ল্যাক কার্বন বের হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাত ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বায়ুমানে নিচে থাকে। এ সময় মূলত ট্রাকগুলো চলাচল করে। যানবাহনের দূষণ রোধে এখনই আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

ট্রাফিক রমনা বিভাগের উপকমিশনার জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে চলাচলের সময় কোনো গাড়ি থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখলে আমি নিজেই সেই গাড়ি থামিয়ে সার্জেন্টের কাছে নিয়ে মামলা দিই। এভাবে আমাদের সব সদস্য কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে নিরলসভাবে কাজ করছেন। আইন অনুয়ায়ী বাসসহ অন্য যানবাহনগুলোকে মামলা দিচ্ছে। তবে রাজধানীতে চলাচলরত যানবাহনের কালা ধোঁয়া রোধে সরকারের অন্য সংস্থাগুলো যথাযথ ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে আমাদের একক চেষ্টায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।’

মূলত ফিটনেসবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া বেশি ছড়ায়। যানবাহনের ফিটনেস সনদ দিয়ে থাকে বিআরটিএ। জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেস আমরা বছরে একবার দেখি, এরপর ইঞ্জিনে সমস্যা হয়ে কালো ধোঁয়া বের হলে দায় আমাদের না। কালো ধোঁয়া বন্ধের বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। এ ছাড়া পুলিশ ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করে। আমরাও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি নিয়মিত। পরিবেশ বাঁচাতে গাড়ির মালিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানিয়েছেন, সমিতির পক্ষ থেকে কালো ধোঁয়া বন্ধে পরিবহন মালিকদের তাগাদা দেওয়া হয়। এরপরও কোনো মালিক এমন যানবাহন রাস্তায় নামালে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

পুলিশ ও বিআরটিএর কাছে কালো ধোঁয়ার দূষণের মাত্রা পরিমাপের কোনো যন্ত্র নেই। ফলে ধোঁয়ার দূষণ রোধে তাদের নিয়মিত আইনি কার্যক্রম পরিচালনায় পিছিয়ে থাকতে হয় বলে জানিয়েছেন দুই সংস্থার কর্মকর্তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত