প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট বৈশি^ক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে বর্তমানে মূলস্ফীতি ও লোডশেডিংয়ে দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। গতকাল রবিবার নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন চিলাহাটি এক্সপ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একদিকে মূল্যস্ফীতি আর অপর দিকে এখন বিদ্যুৎ নেই। এ দুটো কষ্ট আমার দেশের মানুষ পাচ্ছে। আর একবার যদি বিদ্যুতের পাখায় বাতাস খাওয়ার অভ্যাস হয়ে যায়, তারপরে না পেলে তো আরও কষ্ট হয়ে যায়। এটাও তো বাস্তব কথা।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী গ্যাস, তেল, কয়লা সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়াতে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে, টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না- এরকমই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। যার জন্য, আমি জানি এ গরমে মানুষের তো কষ্ট হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী নীলফামারীর চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে ও পতাকা নেড়ে ট্রেনটির উদ্বোধন করেন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ ৮০০ যাত্রী বহনের ক্ষমতা সম্পন্ন চিলাহাটি এক্সপ্রেস সপ্তাহে ছয় দিন চিলাহাটি-ঢাকা-চিলাহাটিতে চলাচল করবে। হলদিবাড়ী-চিলাহাটি রুটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু করায় চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন নীলফামারী জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠেছে। পণ্য বোঝাই ওয়াগনের পাশাপাশি এই রুটে আন্তঃদেশীয় মিতালী এক্সপ্রেস চলাচল করছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জেল হোসেন মিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রেলওয়ে সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনও বক্তব্য দেন।
নতুন ট্রেন পেয়ে উচ্ছ্বসিত এলাকাবাসী : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে দিবাকালীন আন্তঃনগর চিলাহাটি এক্সপ্রেস বাঁশি বাজিয়ে ও সবুজ পতাকা উড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের সময় এলাকার হাজার হাজার মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। চিলাহাটি-ঢাকা চলাচলের নতুন ট্রেন পেয়ে আনন্দিত এলাকাবাসী। এমন আনন্দে স্টেশন প্রাঙ্গণ এবং অনুষ্ঠানস্থলে জমে উৎসুক মানুষের ভিড়। তাদেরই একজন ভোগড়াবুড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম ভোগড়াবুড়ি গ্রামের ব্যবসায়ী আফসার উদ্দিন (৫০) বলেন, ‘হামার মেলাদিনের আশা ছিল নয়া এখান ট্রেনের। প্রধানমন্ত্রী হামার সে আশা পূরণ করিল। এ্যালা এলাকার মানষির দিনে ও রাইতে ঢাকা যাওয়া-আইসা খুব সহজ হইল। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এলাকার মাইনষি দোওয়া করেছি।’
সংসদে প্রধানমন্ত্রী: মহামারী করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পুরো বিশ্ব সংকেটর সময় পার করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলমান এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ও নিজেদের খাদ্য নিজেরাই উৎপাদন করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সদ্যপ্রয়াত ডা. আফছারুল আমীনের ওপর সংসদে আনা শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
আফছারুল আমীন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত শুক্রবার ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, স্যাংশন, পাল্টা স্যাংশনের কারণে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি তেলের অভাব, জ্বালানির অভাব যার জন্য এখন শুধু বাংলাদেশই নয়, উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা বিভিন্ন দেশেই কিন্তু জ্বালানির অভাব হচ্ছে। লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে সমস্ত পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সবাইকে অনুরোধ করব যে বিদ্যুৎ ব্যবহারে একটু সাশ্রয়ী হতে হবে বা সব জিনিস ব্যবহারেই সাশ্রয়ী হতে হবে। তাছাড়া আমাদের খাদ্য উৎপাদনও বাড়াতে হবে, নিজেদের চেষ্টাই আমাদের করে যেতে হবে। কারণ বিশ্বের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আর কত দিন চলবে কেউ বলতে পারে না বা হয়তো বিশ্ব পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেও যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের রক্ষার জন্য, তাদের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে যা যা করার আমরা করে যাচ্ছি।’
আফছারুল আমীনের স্মৃতি স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আফছারুল আমীন সাহেব ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগ করে এসেছেন, প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই অংশগ্রহণ করেছেন। নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, দলের প্রতি তার নিষ্ঠা সত্যি অতুলনীয়। শুধু সংসদ সদস্য না, মন্ত্রী হিসেবেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে তিনি অত্যন্ত সাফল্য দেখিয়েছেন। তাকে প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব দিলাম, বাস্তবে আজ যে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা এত সাফল্য অর্জন করেছে তার ভিত্তিটা কিন্তু তিনি করে দিয়ে গেছেন। তার মৃত্যু আমাদের দেশের জন্য, আমাদের দলের জন্য বিরাট ক্ষতি। অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।’
শোক প্রস্তাবের আলোচনায় আরও অংশ নেন আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ, নুরুল ইসলাম নাহিদ, মোতাহার হোসেন, সাইফুজ্জামান, মুহিবুল হাসান চৌধুরী, ওয়াসিকা আয়শা খান, জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু ও মশিউর রহমান রাঙ্গা। আলোচনার পর শোক প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে গৃহীত হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নীলফামারী প্রতিনিধি ইনজামাম-উল-হক নির্ণয়।
